এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই পৌনে ১২ কোটি টাকার
রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
রিয়াদ হোসেন
স্টিলের কাঠামো বা প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবন তৈরিকে উত্সাহিত করতে সরকার এ খাতের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি শুল্ক সুবিধা দিয়ে আসছে অনেক দিক থেকেই। কিন্তু এই সুবিধার আওতায় স্বল্প শুল্কে কাঁচামাল ও পণ্য আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে একই পণ্য বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণ শুল্ক পরিশোধ করে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ফলে সার্বিকভাবে প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবন বা কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া উদ্যোগও কাজে আসছে না।
সম্প্রতি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকার বিকাশ কাটিং অ্যান্ড করুগেটেড ইন্ডাস্ট্রিজে অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা পায়। তাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে রেয়াতি শুল্ক সুবিধায় প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবনের বিভিন্ন কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আনলেও এ ধরনের কাঠামোর উপযোগী যন্ত্রপাতি তৈরি না করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এক বছরের হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি এই উপায়ে ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই সুবিধা নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়ায় রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এনবিআর ব্যাপকভাবে অভিযান চালালে এ ধরনের শত শত কোটি টাকার অনিয়ম বের হবে। বর্তমানে প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবনের যেসব উপাদান আমদানি হয়, তার শুল্ককরের হার ৬৯ শতাংশ। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে এ ধরনের কাঠামোর উপযোগী পণ্য তৈরির শর্তে হ্রাসকৃত শুল্ক হার নামিয়ে আনা হয়েছে ৩৭ শতাংশে। অর্থাত্ আমদানিকারক প্রায় ২২ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পায়।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি আমদানিকারক বিকাশ কাটিং অ্যান্ড করুগেটেডের পানগাঁও কাস্টমস হাউজের মাধ্যমে খালাসের প্রক্রিয়ায় থাকা একটি পণ্য চালানে আপত্তি জানায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। এরপর কারখানাটিতে সরেজমিনে ব্যাপকভিত্তিক পরিদর্শন করে গোয়েন্দা বিভাগ। তাতে দেখা যায়, যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করা হয়, তার উত্পাদনে যে ধরনের লোকবল দরকার, তা নেই প্রতিষ্ঠানটির। যেসব মেশিনপত্র রয়েছে, তাও সেকেলে, মরিচা ধরা এবং বলতে গেলে অকেজো। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহূত বেশির ভাগই। পরিদর্শনকালে উত্পাদিত কোনো পণ্য পাওয়া যায়নি। বরং বিক্রয় রেজিস্ট্রার পরীক্ষা করে কেবল করুগেটেড শিট (এক ধরনের স্টিলের পণ্য) যা দেশব্যাপী বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে, যারা প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবন ব্যবহারকারী নয়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের রেয়াতি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জোরালো নজরদারির মধ্যে আনা দরকার। এছাড়া আলোচ্য প্রতিষ্ঠানের রেয়াতি সুবিধা স্থগিত করা এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অবশ্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বিকাশ কাটিংয়ের মালিক মো. খাজা নেহাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আমার কারখানা চলমান। কোনো পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করেছি, এমন কোনো প্রমাণ নেই। আমার শিল্প তো পুরোনো, ফলে মেশিনে কিছু ধূলিবালি জমতেই পারে। তিনি বলেন, আমি কেবল করুগেটেড নয়, সব পণ্যই তৈরি করি। কিছু ব্যবসায়ী আমাকে হয়রানি করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব করাচ্ছে।
