অণুগল্প

ওয়ান, টু...সাড়ে টু

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২২

সারা দিন অস্থিরতায় দিন কাটে মায়ের। কোনোভাবেই তাকে রোখা যায় না। এজন্য মায়ের মনটা প্রায় খারাপ হয়। ভাবে, আমার কপালে কেন এ দশা? অন্য মায়েরা কি এরকম পরিস্থিতি সামলান? মাঝে মাঝে বিরক্ত হন আবার কখনো কখনো মনে হয়, কোন পুণ্যের ফল আমার এই সাত রাজার ধন! অর্থপূর্ণ। চেহারায় মায়াবী একটা ভাব, চোখ দুটো পাগল করা হরিণী। ওকে দেখলে সবাই আদর করে। কেউ অর্থপূর্ণকে আদর করলে মায়ের মন ভালো হয়ে যায়। অর্থপূর্ণও এমন ভাব নেয় যেন ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানে না। অর্থপূর্ণর এই ভাবটাই মাকে দোলায়িত করে। ওর হাতে সারাক্ষণ মোবাইলফোন নয়তো টিভিতে কার্টুন দেখা। মোবাইলফোন টিপছে তো দেখছে, অন্যকিছুতে মন নেই। কার্টুনেও তাই। মায়ের কাছে সবচেয়ে বিড়ম্বনা ওর খাওয়া। ঘণ্টা দেড়েক তার জন্য বরাদ্দ। মুখে ভাত নিয়ে চুপ করে থাকে। হাতের মোবাইলফোনে দিব্যদৃষ্টি। খাবার খেতে গিয়ে প্রতিবেলা গজগজানি মাকে অসহ্য করে তোলে। আরো একটা বিড়ম্বনার কারণ দুপুরে ঘুমায় না, এমনকি রাতেও সহজে ঘুমাতে চায় না। মা প্রায়ই তার বাবাকে বলে, ‘ছেলেটাকে একটু শাসন করো। ও সারা দিন আমাকে জ্বালিয়ে মারে।’ বাবা উত্তরে কিছু বলে না। শুধু সান্ত্বনার বাণী শোনায়, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।

বয়স সাত হলে কী হবে? এরই মধ্যে চোখে রঙিন চশমা। বছর দুয়েক আগে একজন বড় ডাক্তার চোখ দেখে চশমা দিয়েছেন। প্রথম যেদিন ও চশমা পরেছিল সেদিন মায়ের মনটা একটু খারাপই হয়েছিল। এই অল্প বয়সে পাওয়ার চশমা!

অর্থপূর্ণ মাকে খুব একটা ভয় পায় না। বাবাকে কিন্তু ভয় পায়। বাবা যদিও অর্থপূর্ণকে কোনোদিন বকেনি, তারপরও বাবাকে ভয় পায়। বাবা মোবাইলফোনে অফিসের কাউকে মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে বকেন। এটা অর্থপূর্ণ শুনতে পায়। ওর ধারণা বাবা মুখে যতোই আদর করুক না কেন বাবা খুব রাগী।

বাবা একদিন অর্থপূর্ণকে একটা গল্প বলে। গল্পটা শুনে অর্থপূর্ণ খুব মজা পায়। ভেতরে ভেতরে একটু-আধটু ভয় পাবার লক্ষণ টের পায় বাবা। পুলিশ নামটা ওর মনে গাঁথা হয়ে গেছে। বাবাও সেই পুলিশের গল্প শোনায়—এক লোকের কাছ থেকে কথা আদায় করতে, পুলিশ সংখ্যা গুনতে থাকে। এই সংখ্যা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ। আর কোনো সুযোগ থাকবে না। শাস্তি নির্ঘাত।

একদিন রাতে অর্থপূর্ণ কোনোভাবেই ঘুমাচ্ছিল না। এদিকে মায়ের প্যানপ্যানানিতে বাবাও শান্তিতে ঘুমাতে পারছিল না। পুলিশের সেই সংখ্যা গণনাটা মনে পড়ে গেল বাবার। সঙ্গে সঙ্গে গণনা শুরু করল—ওয়ান, টু, একটু বিরতি দিয়ে সাড়ে টু...অমনি কাজ হয়ে গেল। অর্থপূর্ণর চোখ বন্ধ। বাবা বুঝতে পারে কাজ হয়েছে। তারপরও বলে যায়...। থ্রি বলার আর সুযোগ কোথায়—অর্থপূর্ণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন!

এরপর থেকে মা-ও সেই সূত্র কাজে লাগিয়ে গুনতে থাকেন—ওয়ান, টু...সাড়ে টু...।