কত মানুষ রাস্তায় নামলে স্বৈরশাসকের পতন ঘটানো সম্ভব?

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৩৯

একজন স্বৈরশাসকের পতন ঘটাতে কোন কৌশল সবচেয়ে বেশি কার্যকর? সহিংস প্রতিবাদ, নাকি অহিংস আন্দোলন? আর ক্ষমতা থেকে কোনো রাজনীতিককে সরাতে এরকম বিক্ষোভ কত বড় হতে হবে? কত মানুষকে জড়ো করতে হবে? বিবিসির ডেভিড এডমন্ডসের রিপোর্ট :হার্ভার্ডের একজন গবেষক এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণা চালিয়েছেন বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের দেশে-দেশে যেসব গণ-আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ হয়েছে সেগুলোর ওপর। এই গবেষণার ভিত্তিতে তিনি বলছেন, কোনো জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ যদি গণবিক্ষোভে যোগ দেয়, তাতেই তারা সফল হতে পারে।

বিগত কয়েক দশকে বিশ্বে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর সফল আন্দোলনের অনেক নজির আছে। ১৯৮০-এর দশকে কমিউনিস্ট শাসনামলে পোল্যান্ডে হয়েছিল সলিডারিটি আন্দোলন। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলেছে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পতন ঘটেছিল গণ-আন্দোলনের মুখে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয় সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। একেবারে অতি সাম্প্রতিককালের উদাহারণও আছে। তথাকথিত আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিশিয়ার স্বৈরশাসক জিনে আল-আবেদিন বেন আলিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মাধ্যমে। গত বছর এরকম আরেকটি সফল বিপ্লবের উদাহরণ হচ্ছে সুদান। সেখানে আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে ওমর আল-বশিরকে। একইভাবে আলজেরিয়ায় ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকাকে। আমাদের স্মরণকালের মধ্যেই ঘটেছে এসব সফল গণ-আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের পথ ধরে এসব দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে।              এই মুহূর্তে বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে আছে বেলারুসের বিক্ষোভ। একটি বিতর্কিত নির্বাচনে প্র্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেংকো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণার পর সেখানে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। এই বিক্ষোভ দমনে সরকার সেখানে নিষ্ঠুর বল প্রয়োগ করছে। এখনো পর্যন্ত এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণই আছে। কিন্তু এই আন্দোলনে সাফল্যের সম্ভাবনা কতটা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এরিকা চেনোওয়েথ ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ বলছেন, ‘গণ-আন্দোলনে সাফল্যের হার কমছে।’ প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ তার গবেষণাটি চালিয়েছেন মূলত স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে, গণতান্ত্রিক দেশে নয়।

তবে সমস্যাটা হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র আর গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে। কোন দেশকে স্বৈরতান্ত্রিক আর কোন দেশকে গণতান্ত্রিক বলা হবে সেটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কোন দেশ কতটা গণতান্ত্রিক বা কতটা স্বৈরতান্ত্রিক, তার মাত্রা নিয়েও আছে বিতর্ক। আর সহিংস আন্দোলন থেকে অহিংস আন্দোলনকে কীভাবে আলাদা করা যাবে, সেটা নিয়েও আছে নানা মত। কিন্তু সাদা চোখে এটা বলাই যেতে পারে, কিছু বিক্ষোভ স্পষ্টতই সহিংস আর কিছু বিক্ষোভ স্পষ্টতই অহিংস। যেমন গুপ্তহত্যা নিঃসন্দেহে একটি সহিংস কৌশল। আবার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, দেনদরবার,  পোস্টার সাঁটানো, কর্মবিরতি, অবস্থান ধর্মঘট, ওয়াকআউট—এগুলোকে অহিংস আন্দোলনের কৌশল বলে বর্ণনা করা যায়।

এরিকা চেনোওয়েথ ও তার সহযোগী গবেষক মারিয়া স্টেফান ১৯০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে যেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো বিশে­ষণ করেছেন। এই গবেষণা শেষে তারা এমন উপসংহারে পৌঁছেছেন যে সহিংস আন্দোলনের চাইতে অহিংস গণ-আন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনা দ্বিগুণ। অধ্যাপক চেনোওয়েথের মতে, এর একটা সহজ উত্তর হচ্ছে, যখন কোনো আন্দোলনে সহিংসতা হয়, তখন সেটা সেই আন্দোলনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

অহিংস আন্দোলনে অনেক বেশি লোক যোগ দিতে আগ্রহী হবে। কারণ অহিংস আন্দোলনে ঝুঁকি কম। যেমন নারী, শিশু, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীরাও এরকম আন্দোলনে যোগ দেয়। উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক সার্বিয়ায় স্লোবোদান মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে বুলডোজার বিপ্লবের কথা। সেখানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সৈন্যরা কেন গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, সে প্রশ্নের উত্তরে সৈন্যরা বলেছিল, তারা গুলি চালাতে পারেনি, কারণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তাদের পরিচিতজনেরা ছিল।

কোন বিক্ষোভে কত মানুষ জড়ো হলে সেটি লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে, সে সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছেছেন প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ। তার মতে, কোনো জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ যখন প্রতিবাদ বিক্ষোভে যোগ দেয়, তখন এটির সাফল্য প্রায় অবশ্যম্ভাবী। এখন সরকার পতনের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষকে বিক্ষোভে যোগ দিতে হবে—এই নিয়মটা একেবারে যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য তা নয়। অনেক আন্দোলনে এর চাইতে অনেক কম মানুষ যোগ দিলেও তা সফল হয়েছে। আবার কোনো কোনো বিক্ষোভে এর চেয়ে বেশি মানুষ অংশ নেওয়ার পরও তা ব্যর্থ হয়েছে। যেমন বাহরাইনে ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থাধান।

প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ এখন গবেষণার দ্বিতীয় একটি পর্যায় সম্পন্ন করেছেন, যেখানে সাম্প্রতিককালের গণবিক্ষোভগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার নতুন গবেষণার ফল আগের গবেষণার ফলকেই সমর্থন করছে। গবেষণায় তার চোখে ধরা পড়া দ্বিতীয় আরেকটি ধারা হচ্ছে, আন্দোলনের সাফল্যের হার কমে গেছে। এই সাফল্যের হার সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে কমেছে সহিংস আন্দোলনের বেলায়। প্রতি ১০টি সহিংস আন্দোলনের ৯টি এখন কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। অহিংস আন্দোলনও এখন আগের তুলনায় কম সফল হচ্ছে।