করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে ধনী দেশগুলোর কাড়াকাড়ি

বাংলাদেশের মতো দেশের ভাগ্যে কী হবে

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:২৫

করোনা ভাইরাস মহামারি থেকে মুক্তি পেতে ভ্যাকসিনের দিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। এখন পর্যন্ত কোনো টিকা অনুমোদন না পেলেও ধনী দেশগুলোর মাঝে অগ্রিম টিকা কেনার প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এ অসম প্রতিযোগিতা দরিদ্র এবং মধ্যম আয়ের দেশের সব মানুষের টিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন এখনো আসেনি কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়েই অগ্রিম কোটি কোটি ডোজ কিনে রাখছে ধনী দেশগুলো। বাংলাদেশের মতো দেশের ভাগ্যে কী হবে? দাতব্য সংস্থা অক্সফামের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিন উত্পাদন সক্ষমতার ৫১ শতাংশই কিনে ফেলেছে। কিন্তু ওই দেশগুলোতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষের বসবাস। ধনী দেশের এই কাড়াকাড়ির কারণে আবিষ্কারে এগিয়ে থাকা পাঁচটি ভ্যাকসিনও যদি সফল হয় তবু ২০২২ সালের আগে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিন নিতে পারবে না বলে সতর্ক করেছে অক্সফাম।

চলমান জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে ভ্যাকসিনের আলাদা চুক্তিকে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ উল্লেখ করে একে অন্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন মহাসচিব।

আইসিডিডিআরবি’র এমিরেটাস বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিনবিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ড. ফেরদৌসী কাদরী বিবিসিকে বলেছেন, ‘ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য কিন্তু অনেক প্রতিযোগিতা হবে। গ্যাভি, সেপি, ডব্লিউএইচও এই প্রতিযোগিতার আশঙ্কা করেই কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি তৈরি করেছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই থাকবে।’

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের জন্য অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে প্রচেষ্টা চলছে ২০২১ সালের মধ্যে দুই বিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার। এর মধ্যে এক বিলিয়ন ডোজ বরাদ্দ থাকবে ৯২টি নিম্ন আয়ের দেশের মানুষের জন্য। দেশগুলোয় পৃথীবির মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বসবাস। বাংলাদেশও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির অধীনে প্রতিটা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্যাকসিনের নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ১৫৬টি দেশ কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিতে ভ্যাকসিন সহযোগিতায় অংশীদার হয়েছে।

কিন্তু এ কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি কতটা সফল হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সমীর কুমার সাহা বলেন, এখানে সমতা আনাটা খুব কঠিন হবে। কারণ চীন জয়েন করেনি, আমেরিকাও কিন্তু জয়েন করেনি। নিম্ন আয়ের দেশগুলো কীভাবে এটাকে ম্যানেজ করবে সেটার একটা চিন্তা এবং এর বিতরণটা কিন্তু নিম্ন-আয়ের দেশের জন্য আরো জটিল হয়ে যাবে বলে আমার কাছে মনে হয়।

বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার-এর রিপোর্টে দেখা যায়, তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে থাকা একাধিক ভ্যাকসিন ব্রিটেন নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য মাথাপিছু পাঁচ ডোজ বুকিং দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ মাথাপিছু একের অধিক ডোজ নিশ্চিত করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ন্যূনতম এক ডোজ নিশ্চিত করতে উদ্যোগী ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশও।

বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে একাধিক ভ্যাকসিন পেতে তত্পর রয়েছে। এর জন্য অর্থ বরাদ্দও রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘এখানে ট্রায়াল হবে। আরো ট্রায়ালের জন্য যোগাযোগ করেছে। সরকার অনুমোদন দিলে হবে।’

যদিও বাংলাদেশ প্রস্তুতির কথা বলছে, অনেক দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কিন্তু ভ্যাকসিন ট্রায়াল নিয়ে দৃশ্যত অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। অনেক দেশই দ্রুত নিজ দেশে ভ্যাকসিন ট্রায়াল শুরু করেছে। বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করায় চীনের ভ্যাকসিন যথাসময়ে ট্রায়াল শুরু করতে পারেনি।

কোভিড-১৯ জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ওপর এর ট্রায়াল হওয়া দরকার। ট্রায়ালে যুক্ত হলে টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকে।

আইসিডিডিআরবি চীনের ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় থাকা অন্য আর কোনো ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের কোনো চেষ্টা আছে কি না জানতে চাইলে আইসিডিডিআরবির এমিরেটাস বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী জানান, আমরা চাইলে যে কোনো ভ্যাকসিন আমরা ট্রায়াল করতে পারি। অক্সফোর্ডেরটাও করা উচিত। কিন্তু আমরা একা চাইলে তো হবে না। এটা যারা গবেষণা করছে তাদেরও আগ্রহ থাকতে হবে।

ভ্যাকসিনের প্রতিযোগিতার কারণে সরকারকে ভ্যাকসিন বুকিং দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশের কোভিড-১৯ জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি। গ্যাভির ভ্যাকসিন পেতে বেশ দেরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশেরও ভ্যাকসিন বুকিং করা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেছে কমিটি।