শুধু হতাশা নয়, স্বস্তিও আছে

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:১৩

আশ্বিন মাস চলছে। সামনে কার্তিক মাস। পরের মাস অগ্রহায়ণ। ফসল ওঠার কারণে শুনেছি, একসময় নাকি এই অগ্রহায়ণই ছিল বাঙালির প্রথম মাস। তা আজ না হোক—এ মাস আশার মাস। ফসল উঠবে—আমন ফসল। পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে উত্সব হবে। কিন্তু এর আগের মাসগুলো ছিল একসময় বাঙালির দুর্দিন। ভাদ্র-আশ্বিন-কার্তিক ভীষণ দুঃসময়। এই সময়েই ‘মঙ্গা’ হতো। মানুষের ঘরে ভাত থাকত না। ভিক্ষা করেও দুই মুঠি চাল পাওয়া যেত না। হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পেত। কত লোক না-খেয়ে মারা যেত, তার হিসাব কে রাখে? আমাদের সৌভাগ্য, সরকারি প্রচেষ্টায় ‘মঙ্গা’ দূরীভূত হয়েছে। উত্তরবঙ্গে কেন, বাংলাদেশের কোথাও এখন আর ‘মঙ্গা’ নেই। ভরা ভাদ্র-আশ্বিনে বন্যার পরেও মানুষের ভাতের অভাব হচ্ছে না। দুই ফসল থেকে তিন ফসলে আসতে পারাতেই এই অগ্রগতি। আগে ছিল শুধু ‘আউশ’ ও ‘আমন’। একরপ্রতি ফলনও কম। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে ওঠে বোরো ধান, যা আজ আমাদের প্রধানতম ফসল। দুই থেকে তিন ফসল, অভাবনীয় সফলতা, বাম্পার ফলন সম্ভব করেছে বাংলাদেশের আজীবন পরিশ্রমী কৃষক সম্প্রদায়। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে কষ্ট করে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সার পাক বা না পাক, সেচের পানি পাক বা না পাক, ঋণ কেউ দিক বা না দিক আমাদের প্রান্তিক ও গরিব কৃষক, মধ্যবিত্ত কৃষক তার কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন—তার ফসলের দাম না পেলেও।

কোভিড-১৯-এর আক্রমণ প্রশমিত হয়নি। চারদিকে এখনো তার তাণ্ডব চলছে। সরকার বলছে আসন্ন শীতে ‘করোনা-১৯’ আরো তীব্র হতে পারে। এর মধ্যেই তারা বড় দুটো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খেতের ফসল গেছে, যারা মাছ চাষ করেন, তাদের মাছ ভেসে গেছে, কৃষকের গরু-ছাগল গেছে। তারা ভিটেছাড়া হয়েছেন। সাময়িকভাবে খাদ্যাভাবেও কেউ কেউ কষ্ট পেয়েছে। এতত্সত্ত্বেও দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবরে আমাদের মনে দারুণ আশা জাগছে। সচিত্র এই প্রতিবেদন (১২.৯.২০) থেকে দেখা যাচ্ছে কিষান নন শুধু, কিষানিরাও রোপা আমনের চারা লাগাতে ব্যস্ত। জমিতে জল আছে। কোনো তাগিদ ছাড়াই তারা নেমে পড়েছেন তাদের দায়িত্ব পালনে। খুলনা, জামালপুর, গাইবান্ধা ও নওগাঁও অঞ্চলের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যাচ্ছে এখন আমন রোপণের সময়। শাকসবজি উত্পাদনের সময়। বাজারে শাকসবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরবরাহ অপ্রতুল। সেই সরবরাহ সমস্যা মিটবে মাস দুয়েকের মধ্যে। তার জন্যই সারাদেশে কৃষকদের তোড়জোড়। বলা বাহুল্য, এটা তারা করছে বন্যায় অবর্ণনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও। এখনো অনেক কৃষক কৃষিঋণ পাননি। শ্রমিকের সমস্যা আছে। নগদ অর্থের সমস্যা আছে। রোপা আমনে ‘চারা’ লাগে। তার অভাব আছে, যদিও সরকার তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে যেসব অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে সেসব অঞ্চল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। এতত্সত্ত্বেও কৃষকরা লেগে পড়েছেন জীবনের সন্ধানে।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন কৃষকরা। তারাই আমাদের দেবেন খাদ্যনিরাপত্তা। এ কথা ভেবেই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল কর্মজীবী মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, চাষি, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানীসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। কাগজে দেখলাম, তিনি শুধু পেশাজীবী ও শ্রমজীবীদের কথাই বলছেন না, তিনি রপ্তানি পারফরম্যান্সের কথা বলছেন, বলছেন রেমিট্যান্সের কথা। অর্থমন্ত্রী কৃষির কর্মচাঞ্চল্য, রপ্তানির অগ্রগতি এবং রেমিট্যান্সের আশাবাদ প্রবাহের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি নিশ্চিত ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ ‘এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এডিবি’ মাত্র দুই মাসের অগ্রগতি দেখে এই পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু ‘এডিবি’ এ-ও বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে আছে শুধু বাংলাদেশ, চীন ও ভিয়েতনাম’।

এ খবরে সবাই আশায় বুক বাঁধবে। কারণ, এখনো করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব প্রশমিত হয়নি। জনজীবনও এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। নতুন ধারণামতে, এটা হচ্ছে নিউ নরম্যাল পরিস্থিতি। অর্থাত্ কোভিড-১৯ নামীয় ভাইরাস থাকতেই এসেছে। এর সঙ্গেই বসবাস করে জীবন-জীবিকা চালাতে হবে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কেন, ‘এডিবি’ কথিত ৬ দশমিক ৪ শতাংশও যদি প্রবৃদ্ধির হার হয়, তাহলে কম কী? তবে একটা কথা আছে। অতীতে দেখা গেছে ‘এডিবি’, ‘বিশ্বব্যাংক’ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস ঠিক হয়নি। ২০২০-২১ অর্ধবছরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরিত হোক—এটাই দেশবাসীর কামনা।

বলা বাহুল্য, এই অগ্রগতির তিন স্তম্ভ। এক নম্বরে কৃষি খাত, যা খাদ্যনিরাপত্তা জোগায় এবং মানুষের জন্য কাজ জোগায়। দুই নম্বরে আছে রেমিট্যান্স। এটা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ‘লাইফলাইন’। ১ কোটি/সোয়া কোটি পরিবার গ্রামীণ পরিবার রেমিট্যান্সের উপকারভোগী। বস্তুত তাদের ক্যাশেই গ্রামীণ অর্থনীতি উজ্জীবিত রয়েছে। গ্রামের হাটবাজার বেচাকেনা, বিদ্যুতের ব্যবহার, যাতায়াতব্যবস্থা, মানুষের চলাচল ইত্যাদিই এর লক্ষণ। দেখা যাচ্ছে, গরিব কৃষকের ছেলেরা ডলার রোজগারের জন্য উদ্গ্রীব। যারা দেশে আটকা পড়েছে তারা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট চাইছে। এর জন্য তাদের রাস্তায় নামতে দেখা গেছে। এই কঠোর পরিশ্রমী প্রবাসীরা যে টাকা দেশে পাঠায় তার বরকত অনেক বেশি। তারা যা রোজগার করে সবই দেশে আনে। এর বিপরীতে ডলার পাচার করে না অন্য অনেকের মতো। দেখা যাচ্ছে, এ কারণে এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের কারণে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধির দিকে। জুলাই-আগস্ট এই দুই মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ কোটি ডলার। অথচ আশঙ্কা করা হয়েছিল কোভিড ১৯-এর কারণে আমাদের ডলার আয় কমে যেতে পারে। না, তা হয়নি যা ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য সুসংবাদ। সুসংবাদ অর্থমন্ত্রীর জন্যও। অর্থমন্ত্রী আরো আশ্বস্ত হতে পারেন। অর্থনীতির তৃতীয় স্তম্ভ রপ্তানি। পারফরম্যান্স দেখে আমাদের রপ্তানি মানেই হচ্ছে তৈরি পোশাক রপ্তানি। সামনে শীত। পবিত্র ক্রিস্টমাস। এই উপলক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার চাঙ্গা হবে বলে সবার ধারণা। অতএব তৈরি পোশাক রপ্তানির পারমিট অনেকটা বাড়বে। এটাও আমাদের জন্য স্বস্তির খবর। তবে কিছু কাজ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদন, যা কিছুদিন আগে স্থাপন হয়েছে, তা থেকে জানা যায় প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের অর্থ ছোট ছোট ব্যবসায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না। বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, বড়রা ঠিকই পেয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। আজকাল বড় বড় কোম্পানি খাদ্যবস্তু ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছে। যেমন আটা, ময়দা, মোয়া-চিড়া, লবণ ইত্যাদি জাতীয় পণ্য খুবই ছোট আকারে উদ্যোক্তারা তৈরি করতেন।  কিন্তু  এখন প্রতিযোগিতার জন্য তাদের টিকতে হচ্ছে।  কিন্তু  তাদের পুঁজির অভাব। করোনা-১৯ এসে এদের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। তারা পুঁজি ভেঙে খেয়েছে। সব ক্যাশ শেষ করেছে। দোকান-প্রতিষ্ঠান, উদ্যোগ চালু করার মতো অবস্থায় নেই। তাদের সহজ শর্তে পুঁজি প্রদানের ব্যবস্থা না করতে পারলে সমূহ ক্ষতি আশঙ্কা। এর কারণটা বুঝিয়ে বলা দরকার। আমরা জানি, বড়দেরও পুঁজির অভাব আছে। কিন্তু তা সংগ্রহ করতে পারে বিভিন্নভাবে। ব্যাংকে তাদের প্রবেশাধিকার আছে। নানা জায়গায় তাদের রক্ষিত টাকাও আছে। সেই টাকা তারা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু ছোট ও মাঝারিরা পারেন না। তাদের টেকাই দায়। যেমন ছোট ছোট ওষুধের দোকান, শাড়ির দোকান—এগুলো অস্তিত্বের জন্য বহুদিন যাবত্ লড়াই করছে। দেখা যাচ্ছে, বিশাল বিশাল ওষুধের দোকান হচ্ছে। বিশাল বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হচ্ছে, যেখানে শাড়ি ইত্যাদি কাপড়ও বিক্রি হয়। এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এসব প্রতিষ্ঠান কোনোমতে টিকে ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস তাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। অথচ এরা না বাঁচলে অর্থনীতির চাকা অর্ধেকও ঘুরবে না। কারণ এদের ক্রয়ক্ষমতাই বাজারে যায়। এতে ভোগব্যয় বাড়ে, জিডিপির কাজ হয়। এখানেই সবচেয়ে বেশি লোক নিয়োজিত। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আর কত জন কাজ করে। আবার কাগজে দেখলাম ‘মেট্রোরেলে’ শ্রমিকের সংকট। এটা কি ঠিকাদারের কারণে? অর্থাভাবের কারণে ঘটছে নাকি অন্য কিছু? নির্মাণ কাজে লাখ লাখ লোক নিয়োজিত হওয়ার সম্ভাবনা। এসব দিকে সরকার একটু নজর দিলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে নিশ্চিতভাবে। আশা করি, ছোট ও মাঝারিদের প্রতি অর্থমন্ত্রী বিশেষভাবে নজর দেবেন। তাদের হাতে পুঁজি ও ক্যাশ দেবেন।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়