আমজাদ হোসেন হূদয়
বাংলাদেশের বর্তমান সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উত্কণ্ঠার যে বিষয় সেটি হচ্ছে ধর্ষণ। ধর্ষণ যেন সবচেয়ে পরিচিত শব্দ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ধর্ষিত হচ্ছে আমার বোনেরা। এর থেকে বাদ যেন নেই কোনো বয়সের নারীই। পত্রিকার পাতা খুললেই এমন কিছু সংবাদ আমাদের কপালে ভাঁজ এনে দেয় প্রতিনিয়ত। আজ শিক্ষক থেকে শুরু করে, বখাটে, গাড়ির চালক, হেলপারও ধর্ষণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে, এমনকি অনেকাংশে নিজ পরিবারেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধর্ষকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। যা করোনা মহামারিকেও হার মানায়। আজ নিরাপদ নয় বৃদ্ধা থেকে পাঁচ বছরের শিশু পর্যন্ত! আর কত ধর্ষণ!
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন। ধর্ষণের শিকার হওয়াদের মধ্যে ৪০ জনের বয়স ছয় বছর এবং ১০৩ জনের বয়স ১২ বছরের মধ্যে। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাত জন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১২৬ জন নারীর ওপর। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের ছয় মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। গত বছর তথা ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।
অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের অভিযোগের পাশাপাশি সিলেটের এম সি কলেজে গৃহবধূ ধর্ষণ, খাগড়াছড়ি এবং সাভারেও দুই নারীকে ধর্ষণ। এছাড়াও সম্প্রতি আরো বেশকিছু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, রাজধানীর ভাটারার জগন্নাথপুরে সত্-বাবা কর্তৃক মেয়ে ধর্ষণ, ফেনীতে অধ্যক্ষ কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নুসরাতের মৃত্যুসহ এমন অসংখ্য ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা হচ্ছে, যা অজানাই রয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ চলছে অবিরাম, এটি যেন একটি রীতিতে পরিণত হচ্ছে। ধর্ষকের ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি চায় মুক্তিকামী নারী এবং মুক্তি চায় বাংলাদেশ।
ধর্ষণের প্রকৃত কারণগুলো খুঁজে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ধর্ষণের কারণ হিসেবে আমরা অনেকে অবাধ মেলামেশা, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, অশালীন আবেদনময়ী ফ্যাশন, অসুস্থ মানসিকতা, মাদক ইত্যাদি কারণকে আমরা চিহ্নিত করি। ধর্ষণের পেছনের অদৃশ্য আরেকটি কারণ কিছুটা হলেও উন্মোচন করেছে নারীপক্ষ নামক একটি সংস্থা তাদের গবেষণার মাধ্যমে। নারীপক্ষ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা ৩ হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র চার জনের সাজা হয়েছে। ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা হচ্ছে মাত্র চার জনের। মহিলা আইনজীবী সমিতির আরেক জরিপে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এসব মামলার ভেতরে যেগুলোর রায় হচ্ছে সেখানেও আছে দীর্ঘসূত্রতা। এই সুদীর্ঘ সময়ে ধর্ষিতাকেও মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বছরের পর বছর জুড়ে। তাই সুুষ্ঠু বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণের অন্যতম কারণ।
ধর্ষকদের থামাতে প্রতিরোধ একমাত্র উপায় হলেও আরো কিছু পদক্ষেপ আমরা নিতে পারি। যার দ্বারা সুস্থ মানসিকতা গড়ে ওঠবে এবং এসব জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করবে। তা হলো—দেশের মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি জোড় দেওয়া হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে নারী আর ধর্ষণের শিকার হবে না। অধিকার ফিরে পাবে প্রত্যেক নারী। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার নৈতিকতা। তাছাড়াও মাদক থেকে দূরে রাখা, ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার এবং বাংলাদেশ থেকে পর্নো সাইটগুলোকে চিরতরে মুছে দেওয়ার মতো কার্যক্রম হাতে নিলে ধর্ষণ অনেকটা হ্রাস পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
