পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। সমগ্র বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ‘গ্রিন এনার্জি’ অথবা ‘ক্লিন এনার্জি’ নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বে পরিবেশের বিপর্যয় বেড়ে যাওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রাকৃতিকভাবে রিফিল হয়। পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজনে সাধারণত দুই ধরনের জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রথমত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যা সূর্যের আলো, বাতাস, পানি ও বায়োগ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদিত হয়। অন্যদিকে অনবায়নযোগ্য জ্বালানি, যা তেল, কয়লা, গ্যাস ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে উত্পাদিত হয়। উল্লেখ্য তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসগুলো একত্রে ‘ফসিল ফুয়েল’ নামে পরিচিত। সমগ্র পৃথিবীতে পরিবেশ বিপর্যয়ে সৃষ্ট চলমান করোনার মহামারি মোকাবিলায় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়ানো উচিত।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৮৬০ সালে ফ্রান্সে প্রথম নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ‘সোলার এনার্জি’ আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৬ সালে গবেষণায় দেখা যায় যে, সোলার প্যানেলে ব্যবহূত সিলেনিয়াম সূর্য থেকে শোষিত শক্তিতে বিদ্যুত্শক্তিতে রূপান্তরিত করে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ১৯২১ সালে সূর্যরাশ্মি কর্তৃক ‘সোলার এনার্জি’ উত্পাদনে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৮৮৮ সালে বিশ্বে প্রথম নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বায়ুচালিত ‘উইন্ড মিল’ দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু হয়। ১৯৩০ সালের দিকে সমগ্র আমেরিকায় ‘উইন্ড মিল’ চালিত বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিশের শতকের দিকে বায়ুচালিত ‘উইন্ড মিল’ কর্তৃক বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিস্তার সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ‘উইন্ড মিল’ কর্তৃক বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সমগ্র বিশ্বে ‘ক্লিন এনার্জি’ নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সারা বিশ্বে ২০১৬ সালের দিকে বায়ুচালিত ৩ লাখ ৪১ হাজার ৩২০টি উইন্ড টার্বাইন চালু করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৫ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ ঐ উইন্ড মিলগুলোতে কর্মরত রয়েছেন।
যাহোক, নাবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাসেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বায়োগ্যাস সাধারণত গৃহস্থালির অব্যবহূত আবর্জনা অথবা জৈব পদার্থ পচিয়ে অক্সিজেনের অনুপস্থিতে তৈরি করা হয়। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে উত্পাদিত মিথেন গ্যাসের ৬০-৭০ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। বিদ্যুত্ উত্পাদনে বায়োগ্যাস পরিবেশবান্ধব ও জনপ্রিয় হওয়ায় ১৯২০ সালের দিকে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যান্টের নকশা তৈরি শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৮ সালে প্রথম কঠিন বর্জ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ১০ ঘনমিটার আয়তনের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়। অন্যদিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে উনিশ শতকের দিকে পানি কর্তৃক বিদ্যুত্ উত্পাদনের যাত্রা শুরু হয়, যা হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি নামে পরিচিত। সাধরণত হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি উত্পাদন নদী অথবা জলপ্রপাতের স্রোতের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশই জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন পরিবর্তিত হয়ে নদীর স্রোতোধারা কমে যাওয়ায় পানি কর্তৃক বিদ্যুত্ উত্পাদন কমে যাচ্ছে।
পরিবেশের বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের মতো বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশে জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ উত্পাদনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এমতাবস্থায়, বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোয় সমগ্র পৃথিবীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে কয়লা, তেল, গ্যাস ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দৃশ্যমান।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ‘সোলার হোম সিস্টেম’ চালু করেছেন, যা ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৬ মিলিয়নের বেশি গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক সুবিধা পাবে। বাংলাদেশের দক্ষিণে উপকূলীয় অঞ্চলে ‘উইন্ড মিল’ কর্তৃক বিদ্যুত্ উত্পাদন চালু রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে সীমিত আকারে বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস তৈরি হচ্ছে—যা গৃহস্থালিতে স্বল্প পরিসরে হলেও বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটাচ্ছে। খুব শিগিগরই উপকূলীয় অঞ্চলে টাইডাল ও বঙ্গোপসাগরে পানির তরঙ্গ থেকে উত্পাদিত বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে যাচ্ছে।
দৃশ্যত সমগ্র বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অনবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় কম। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো অসম্ভব, তবুও পরিবেশের বিপর্যয় ও স্বাস্থ্যসম্মত টেকসই জীবনযাপনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষণায় দেখা যায় যে, বছরে ‘ফসিল ফুয়েল’ থেকে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে। তাছাড়া ফসিল ফুয়েল ব্যবহারে বিদ্যুত্ উত্পাদনে নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইডসহ বিভিন্ন প্রকার ভোলটাইল জৈব পদার্থ ও হেবি মেটালস প্রতিনিয়ত পরিবেশে লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। আবার ‘ফসিল ফুয়েল’ কম্বাসনে নির্গত বেনজিন, মারকারি, ফরমালডিহাইড ও পার্টিকুলেটস ম্যাটার প্রতিনিয়ত বেড়ে গিয়ে করোনার মহামারিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্বের কোনো কোনো দেশে বর্ধিত জনসংখ্যার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত পারমাণবিক শক্তির জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশ চলমান করোনার মহামারিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, পারমাণবিক শক্তিতে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহূত হয়। এমনকি, বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত পারমাণবিক শক্তির প্ল্যান্ট থেকে রেডিও অ্যাকটিভ বর্জ্য পরিবেশে নির্গত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়।
তাছাড়া গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষতিকর রেডিও নিউক্লাইডস, যেমন—ট্রিটিয়াম, কার্বন-১৪ ও আয়োডিন-১২৯ অসহনীয় মাত্রায় পরিবেশে নির্গত হয়। গবেষণায় আরো দেখা যায় যে, বিদ্যুত্ উত্পাদনে স্থাপিত পারমাণবিক শক্তির প্ল্যান্টের চতুর্দিকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্বাস্থ্যঝুঁকির তীব্রতা ছড়াতে পারে। ইতিমধ্যে, বাংলাদেশে রূপপুরে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্পটি চলমান। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় বিধায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্পটি বর্ধিত জনসংখ্যার বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
যাহোক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃক বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর উপাদান নির্গত না হওয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সীমিত, তবু জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশ বিপর্যয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমগ্র বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সমগ্র বিশ্ব এখন চলমান প্রাণঘাতী করোনায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। এমতাবস্থায়, যদি বিষাক্ত ক্ষতিকর উপাদান বায়ুমণ্ডলে বাড়তে থাকে, তাহলে মানবজাতির পরিবেশ বিপর্যয়ে অজানা অন্য কোনো মহামারির শিকার হওয়ার আশঙ্কাটি থেকে যায়। বিশ্বে যদিও পরিবেশ বিপর্যয়কে আলিঙ্গন করে অনবায়নযোগ্য জ্বালানির রাজত্ব বেড়েছে, তবু নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় অনবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে হবে।
n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সালনা, গাজীপুর
