আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২৬

আমরা আজ যে স্বপ্নের কথা লিখতে যাচ্ছি এই স্বপ্নের উদ্দেশ্য যে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ডটি যার নাম বাংলাদেশ বলে ডাকি তার রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি যা আমাদের এ জনপদের মানুষের জীবনাচরণকে জীবনানন্দের কবিতার মতো সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীন ‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এর ‘বঙ্গ’ থেকে যার নাম শুরু হয়ে ইলিয়াস শাহের ‘বাঙালাহ’ পরে মোগল ‘সুবা’র হাত ধরে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববাংলা, পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ নাম গ্রহণ করা এ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন মোহনীয় তেমনি এর অধিবাসীরা কঠোর পরিশ্রমী বলে নানা প্রতিকূলতায় এ অঞ্চলের ওপরে বারবার দুর্যোগ নেমে এলেও তা খুব তাড়াতাড়ি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

আমরা যদি আমাদের এই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে চাই তবে চলমান রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করতে হবে। যার মাধ্যমে দুর্নীতি রুখে স্বমহিমায় এগিয়ে যাবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। এই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে আমার কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই—

প্রথমত, বাংলাদেশের প্রশাসনিক শহরগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। এর ফলে প্রশাসনের কার্যাবলি নির্বাহের ক্ষেত্রে জটিলতা কমবে সঙ্গে জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তির অবসান হবে এবং রাজনৈতিকভাবে সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়তে সহায়তা করবে। অপরদিকে, শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমে আসার ফলে সুষম উন্নয়ন অর্জিত হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে যেটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বড় রকমের ভূমিকা পালন করবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে যাতে করে সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে খুব দ্রুত শতভাগে উন্নীত করা সম্ভবপর হয়। এবং গবেষণার মাধ্যমে কৃষি, শিল্পসেবা খাতের মানোন্নয়ন করা যাবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে উন্নত গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। সঠিক গবেষণা না থাকলে দেশের কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া যায় না। উপরন্তু দুর্নীতির সম্ভাবনা প্রকট হয়।

তৃতীয়ত, কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং মানোন্নয়নে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে যাতে করে সেখান থেকে শিক্ষালাভ করে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। এতে করে দেশের বেকারত্বের হার অনেকটা কমে আসবে। কমে আসবে দুর্নীতি।

চতুর্থত, কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে হবে। কারণ  কৃষিই এই অঞ্চলের চালিকা শক্তি হিসেবে পরিগণিত। কৃষি উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে চলমান ধারার কৃষিব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করতে হবে এবং সরকারিভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

পঞ্চমত, স্বাস্থ্য খাতের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে হবে। এখন যে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো রয়েছে সেটির কলেবর আরো বৃদ্ধি করে প্রতিটি গ্রামে স্থাপন করতে হবে। এতে করে স্বাস্থ্যসেবা যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হবে। অধিকন্তু, উপজেলা, জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে আরো আধুনিকায়ন করে সব রকমের প্রযুক্তি এনে উন্নত চিকিত্সার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্যসচেতন প্রোগামের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন হতে আগ্রহী করা যেতে পারে।

ষষ্ঠত, অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, কারণ সেনাবাহিনীর কাজে দুর্নীতি সব থেকে কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উন্নত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সঠিক উন্নয়ন প্রকল্প না হলে সে প্রকল্প জনগণের কোনো কাজে আসে না। শুধু দুর্নীতির মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পকেট ভারী হয়। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে গবেষণাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সপ্তমত, অবসর ও বিনোদনের জন্য দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। যেটি বিশ্বের অনেক ধনী রাষ্ট্রও করে থাকে। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তুলনা নেই। এখন শুধু প্রয়োজন সেগুলোকে কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে বেকারত্বের হার কমানো সম্ভব। অপর দিকে দেশের জনগণকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ করতে প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারিভাবে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এর ফলে যারা শিক্ষার্থী তারা নিজেদের সাহিত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত হতে পারবে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে। আর যারা শিশু তারা জীবনের শুরু থেকেই বইয়ের সঙ্গে মানুষের অকৃত্রিম সম্পর্ক দেখে বড় হবে। এর ফলে দেশের অনেক অন্যায় ও দুর্নীতি আপনাআপনিই কমে যাবে।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বঙ্গোপসাগর দুহিতা আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ আমরা কেবল তখনই আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে পরিণত হবে যখন এদেশের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না, শিক্ষাহীন থাকবে না। স্বাস্থ্য, বুদ্ধি এবং অর্থনৈতিকভাবে আমরা হব স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেদিন আমরা একসঙ্গে গলায় গলা মিলিয়ে বলতে পারব—‘এই তো আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ’

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।