কোনো সংক্রামক রোগ যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষকে আক্রান্ত করে, তাহলে তাকে মহামারি বলে। সে হিসেবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস একটি মহামারি। এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন। নয়তো শাস্তি দিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে বোখারী শরীফের ৫৯০৭ নম্বর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য। নবিজি (স) বলেছেন, ‘মহামারি হচ্ছে—আজাবের নিদর্শন। আল্লাহতায়ালা এর মাধ্যমে তার বান্দাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। কাজেই তোমরা যদি কোথাও মহামারির সংবাদ শোন, তাহলে কখনো সেখানে যাবে না। আর যদি তোমাদের বসবাসের নগরীতে মহামারি দেখা দেয়, তাহলে সেখান থেকে পালাবে না’। আবার হতে পারে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। কারণ মানুষ যখন অত্যাচারের সীমালঙ্ঘন করে, তখন আল্লাহতায়ালা তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য শাস্তিও দিয়ে থাকেন। যেমন—পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জলে ও স্থলে যেসব বিপর্যয় প্রকাশ পায়, সব মানুষের হাতের কামাই। (এর উদ্দেশ্য হলো) তিনি মানুষকে তার কৃতকর্মের কিছুটা ফল ভোগ করাতে চান। যেন তারা ফিরে আসে।—সুরা রোম, আয়াত নম্বর ৪১।
এছাড়া উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি নবিজিকে মহামারি সম্পর্কে জিগ্যেস করলাম। তখন তিনি আমাকে জানালেন, এ হচ্ছে একটি শাস্তি। আল্লাহ যাকে চান তার ওপর নিপতিত করেন। তখন মুমিনদের জন্য এটিকে রহমত সাব্যস্ত করেন। এ সময় কোনো ব্যক্তি যদি মহামারি আক্রান্ত হয়ে নিজ ঘরে ধৈর্য ধরে সওয়াবের প্রত্যাশা করে আর এ কথা দৃঢ় বিশ্বাস করে যে, আমার যা প্রাপ্য লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কোনো কিছু স্পর্শ করবে না, তাহলে এমন ব্যক্তি শহিদের সমতুল্য সওয়াবের অধিকারী হবেন। এ হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, অন্যের জন্য আজাব হলেও মুমিন যদি সবর করে সেটি তার জন্য রহমত হিসেবে সাব্যস্ত হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে শরীরে কোনো রোগব্যাধি দেওয়ার মালিকও আল্লাহ। আবার উপশম করার মালিকও আল্লাহ। আল্লাহতায়ালা যেমন—বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি তার প্রতিশেধকও সৃষ্টি করেছেন। বোখারী শরীফের ৫৬৭৮ নম্বর হাদিস। হযরত আবু হুবায়রা (রা) সূত্রে প্রিয় নবি (স) বলেন—আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার নিরাময়ের উপকরণ সৃষ্টি করেননি। এই উপকরণ সম্পর্কে আমরা না জানলে এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের গবেষণার ব্যর্থতা। করোনা মহামারির যেহেতু এখনো প্রতিশেধক তৈরি হয়নি, সেহেতু তার জন্য প্রয়োজন আমাদের সতর্ক থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা। সেক্ষেত্রে প্রিয় নবি বলেছেন, কোনো এলাকায় মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সেখানে যাতায়াত থেকে বিরত থাক। যেমনটি করেছিলেন হযরত ওমর ফারুক (রা)। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ হিজরিতে হযরত ওমর ফারুকের শাসনামলে একবার প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং মহামারি আকার ধারণ করে। সে সময় আবু ওবাইদাহ ইবনুল জাররার নেতৃত্বে একজন মুজাহিদ জিহাদের ময়দানে ছিল। জায়গাটি ছিল ফিলিস্তিনের একটি এলাকায়। মুসলিক সেনাপতি আবু ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ তিনি নিজে মারা যাওয়ার আগে মুয়াজবিন জাবালকে (রা) সেনাপ্রধান নিযুক্ত করে যান। তিনিও মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মহামারিতে মারা যান। খলিফা ওমর যুদ্ধের সময়কালের অবস্থা প্রত্যক্ষ করার জন্য যখন আল কুদশের নিকট প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছলেন তখন তাকে মহামারির কথা জানানো হলো। খলিফা ওমর ফিরে যেতে চাইলে কেউ একজন বললেন, খলিফা ওমর আপনি কি আল্লাহ নির্ধারিত তাকদির থেকে পালাচ্ছেন? তিনি জবাবে বললেন, ‘আমি তো আল্লাহর এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরের দিকেই যাচ্ছি’।
বিভিন্ন শতাব্দীতে এরূপ মহামারির কথা ইতিহাসবিদগণ বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক এবনে আজারি মারাকাশীর বর্ণনা মতে, ৩৯৫ হিজরিতে তিউনিশিয়ায় মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে। অন্ন বস্ত্রের সংকট দেখা দেয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ধনীরা গরিব হয়ে পড়ে। বাইরাওয়ান নগরীর মসজিদগুলো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ঐতিহাসিক ইমাম জাহাবির বর্ণনা মতে, ৪৪৮ হিজরিতে বর্তমান স্পেনে কঠিন মহামারি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সে সময় এত লোক মারা গিয়েছিল যে সেখানকার মসজিদগুলো মুসল্লি শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তাই ঐ বছরটি তাদের নিকট ক্ষুধার বছর হিসেবে পরিচিত।—তারিখুল ইসলাম সিয়ারু আলামিন নুবালা। প্রখ্যাত ফকীহ ও হাদিসবিদ আল্লামা ইবনুল জাওজীর বর্ণনা মতে, ৪৪৯ হিজরি সালে মধ্য এশিয়ায় এক ভয়ংকর মহামারি দেখা দেয়। সেখানে প্রায় ২০ লাখ লোক মারা যায়। প্রতিদিন এ অঞ্চল থেকে প্রায় ১০ হাজার মৃতদেহ দাফনের জন্য বের করা হতো। হাটবাজার বিরান হয়ে যায়। এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। মানুষের রাতদিন কাটে মৃতলোকদের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে করতে। মসজিদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে।—আল মুনতাজাম ফি তারিখিল উমাম। হিজরি নবম শতাব্দীতে খোদ মক্কায় মহামারি দেখা যায়। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানির বর্ণনা মতে জানা যায়, সে সময় মহামারির কারণে মসজিদগুলো বন্ধ হয়ে যায়। পবিত্র মক্কা মোয়াজ্জমা মুসল্লি শূন্য হয়ে পড়ে। প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের বেশি লোক মারা যেত। রবিউল আওয়াল মাসে প্রায় ১ হাজার ৭০০ লোক মারা যায়। সে সময় মাত্র দুই জন মুসল্লি নিয়ে ইমাম সাহেব মাকামে ইবরাহিমের সামনে নামাজ পড়াতেন। অর্থাত্ আমরা বলতে চাই, বর্তমানে আমরা যে মহামারির দুর্বিষহকাল অতিক্রম করছি, অতীতে অনেক সময় এর চেয়েও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সুতরাং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই।
lলেখক :চেয়ারম্যান, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
