নাজমুন্নাহার নিপা
একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের জন্য অজীব ও জীব প্রতিটি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক কারণে এ উপাদানগুলোর যে কোনো একটির পরিবর্তন ঘটলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং পরিবেশদূষণ হয়। মানুষের অসচেতনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণেই পরিবেশদূষণ হচ্ছে ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
খাদ্যের উত্স, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিত্তবিনোদন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। আজকাল বিশ্বের বৃহত্তম সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। জীবাশ্ম জ্বালানির উত্তম মাধ্যম হতে পারে গাছপালা। বৃক্ষের ডালপালা ও পাতা জ্বালানির প্রধান উত্স, যা জ্বালানি সমস্যার অন্যতম সমাধান হতে পারে।
শুধু তাই নয় উদ্ভিদ বাতাসে বিভিন্ন গ্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখে। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেশি হলে তাপমাত্রা বাড়ে, কারণ ঐ গ্যাস তাপ শোষণ করে। গ্রিন হাউস এফেক্ট এ কারণেই হয়। উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে গ্রিন হাউস এফেক্টের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে বাতাসে অক্সিজেন যোগ করে বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাত বজায় রাখে।
একটি বয়স্ক বৃক্ষ ১০ জন মানুষের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে। বাতাস থেকে ৬০ পাউন্ডের বেশি বিষাক্ত গ্যাস শোষণ ও ১০টি এসির সমপরিমাণ তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বাতাসে অক্সিজেন ছাড়া অন্যান্য গ্যাস ও ধূলিকণার পরিমাণ বাড়লে বায়ু দূষিত হয়। শত শত টন কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুর দূষণ রোধ ও তাপদাহ প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসে প্রায় ১০০ গ্যালন পানি নির্গত করে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। এক হেক্টর পরিমাণ মাঝারি বন ১০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ হ্রাস করতে পারে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ শতাংশ ভূমিতে বনজঙ্গল থাকা দরকার। সরকারিভাবে ১৭ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে রয়েছে ৮-১০ শতাংশ। চট্টগ্রামে আছে ৪৩, খুলনায় ৩৮, ঢাকায় ৭, সিলেটে ৬, বরিশালে ৩, রাজশাহীতে ২ শতাংশ। চট্টগ্রাম ও খুলনা ছাড়া সারা দেশে বনভূমির পরিমাণ খুবই নগণ্য। তাই অঞ্চলভিত্তিক বনায়ন অতি জরুরি।
গাছ পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে, অথচ আমরা নির্মমভাবে কেটে ফেলছি। এই ক্ষতি পূরণের জন্য আঞ্চলিক বনায়নের বিকল্প নেই। বনভূমি বায়ুমণ্ডলকে বিশুদ্ধ ও শীতল রাখতে সাহায্য করে। যে অঞ্চলে গাছপালা ও বনভূমি বেশি সেখানে বৃষ্টি হয় বেশি। ফলে ভূমিতে পানির পরিমাণ বাড়ে, চাষাবাদ ও ফসল ভালো হয়। বৃক্ষ মাটির উর্বরতা বাড়ায়, ভূমির ক্ষয় রোধ, ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যা প্রতিরোধেও সহায়তা করে। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণমুক্ত পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচনে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন রক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
আঞ্চলিক বনায়ন ঐ অঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখতে পারে। বলা যায়— কৃষিক্ষেত্রের জন্য গাছ অন্যতম সেরা অংশীদার। গাছ বেশ কয়েকটি ইতিবাচক কাজ করে কৃষিক্ষেত্রে, যেমন : মাটির ক্ষয় হ্রাস করে, উর্বরতা বাড়ায় এবং মাটির আর্দ্রতা অর্জনে সহায়তা করে। পতিত গাছের পাতা মাটির তাপমাত্রা হ্রাস করে এবং মাটিকে খুব বেশি আর্দ্রতা হারাতে বাধ সাধে। ক্ষয়িষ্ণু পাতাগুলো যা মাটিতে পড়ে, সেগুলো গাছের বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিতে পরিণত হয় এবং জীবাণু মেরে ফেলে।
গাছপালা আঞ্চলিক জীববৈচিত্র্য বাড়াতে প্রধান ভূমিকা রাখে, কারণ তারা বন্যজীবনের খাদ্যের উত্স এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলে পরিণত হয়। জীবজগতে খাদ্য বা শক্তির জোগান উদ্ভিদ নিজে তৈরি করতে পারে, অন্য কোনো প্রাণী তা পারে না। প্রত্যেক প্রাণীই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে শক্তির জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। তাই পরিবেশকে সুন্দর রাখতে ব্যাপক হারে বনায়নের বিকল্প নেই। এজন্য আঞ্চলিক বনায়নে মানুষকে উত্সাহিত করতে হবে এবং এটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
