রাজধানীর অদূরে অবস্থিত সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়ন দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী নদী। শত শত একর নদী সিকস্তি খাসজমির ওপর নজর পড়েছে বিত্তবানদের। কেউ লিজ নিয়ে কেউবা না নিয়েই অবৈধভাবে জমি দখল করেছে অনেকে। এমনকি ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত পাওয়া জমিও দখল করে নিয়েছেন শিল্পপতিরা । ফলে ভূমিহীনদের জমিতে এখন উচ্চবিত্তদের সাইনবোর্ড এবং স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সরকারি উচ্চ পর্যায়ের লোকজনও এখানে জমির মালিক আছেন। ভূমিহীনদের নামে বরাদ্দ পাওয়া ভূমিতে ভূমিহীনরা নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে শিল্পপতিদের মিলকারখানা। আবার দেখা গেছে, ভূমিহীনদের নামে সাইবোর্ড আছে ঠিকই কিন্তু তা ভোগ দখল করেন অন্য ব্যক্তি। তেমনি ভূমিহীনদের জমি দখল করে শ্যামল নামে এক প্রভাবশালী ঘর উঠিয়ে ভাড়া আদায় করছেন। তার বক্তব্য, তিনি জমি কিনে নিয়েছেন। জানা গেছে, ভূমিহীনদের আবেদন ছিল নামমাত্র। কারসাজির মাধ্যমে মূলত জমি পেয়েছেন প্র্রভাবশালীরা ।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর ১৬৪৩ নম্বর স্মারকের ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তত্কালীন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুন্সী শাহাবুদ্দিন আহমেদ ধল্লা ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলেশ্বরী নদী তীরবর্তী জেগে ওঠা চর্চা দাগের জমিগুলো হস্তান্তর, দলিল, নামজারি ও খাজনা গ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। তিনি তার মন্তব্যে উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট জমি বছরের বেশির ভাগ সময় ধলেশ্বরী নদীর পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এখানে স্থাপনা গড়ে উঠলে নদীর প্রবাহ বাধা গ্রস্ত হবে, যা পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়বে। নদী তথা পরিবেশ রক্ষায় তিনি তখন বন্দোবস্তের ২৯৭টি সিদ্ধান্ত বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অদ্যাবধি তা বাতিল হয়নি এবং অবৈধভাবে নদী ভরাটও থেমে নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দেশের নামি একটি ফার্নিচার কোম্পানি তাদের জমিতে যানবাহন চলাচলের জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ফোর্ডনগর খেয়াঘাটের দক্ষিণ থেকে উত্তর দিক নদী থেকেই বালু তুলে পাড় ভরাট করে সরকারি প্রকল্প ছাড়াই ২০ ফুট প্রস্থের কাঁচা সড়ক নির্মাণের পর এবার চলছে নদীর মাঝখানে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে নদী ভরাটের কাজ। এদিকে অবৈধভাবে সড়ক নির্মাণ করে ঐ ফার্নিচার মালিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে চেয়ারম্যান জাহিদ ভূঁইয়া বলেন, জনস্বার্থে এ কাজটি করা হয়েছে। পরে যে কোনো একটি প্রজেক্টে সেটা ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ওহাব খান, আব্দুল মজিদ মোল্লা ও ইকবাল হোসেন শামিম বলেন, ফার্নিচার কোম্পানির বিশাল কারখানাটিও খাসজমিতে স্থাপিত। এছাড়া ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত পাওয়া জমিও ঐ কোম্পানি নিয়েছে। ইতিপূর্বে প্রশাসন নদী ভরাটের কাজ উচ্চ্ছেদ করলেও আবার তা চলছে পুরোদমে। বেঙ্গল কার্পেট মিলস্ লিমিটেডের প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ার হুসাইন সাইফুল আজম, ভুক্তভোগী সাভার মধ্যপাড়ার আবুল কালাম আজাদ ও ফোর্ডনগরের বাসিন্দা আরিফ খান বলেন, শুধু নদী আর খাসজমিই নয়, ঐ এলাকায় তাদের এবং অনেক নিরীহ লোকের জমি লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে দখল করে নিয়েছে ঐ ফার্নিচার কোস্পানি । তারা এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক বরাবর।
এদিকে জাতীয় তথ্য বাতায়নে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন তাদের সর্বশেষ হালনাগাদ (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০) আর এস রেকর্ড মোতাবেক ধলেশ্বরী নদীর জমির অবৈধ দখলদারদের তালিকায় চর জলিল এবং ফোর্ডনগর মৌজায় ঐ ফার্নিচারের মালিকসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক এসএম ফেরদৌস বলেন, নদীরপাড় ভরাট করে রাস্তার বিষয়টি তার জানা নেই । বন্দোবস্তের ২৯৭টি সিদ্ধান্ত বাতিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেসগুলো বাতিল হয়নি মনে হয়। তবে তিনি তা বাতিল চেয়ে চিঠি দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে এখনো পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা আসেনি। ৭৬ জনের অবৈধ দখলদারের তালিকা সঠিক আছে কি না সেটা এসিল্যান্ড জানেন বলে জানান তিনি। তবে তিনি এও জানান যে, এসংক্রান্ত তালিকা তৈরি করে এসিল্যান্ডই তার কাছে পাঠিয়েছেন।
