টিকা বাজারে আসা পর্যন্ত যেসব ধাপ পেরোতে হয়

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২০, ২২:৫৩

সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে সবার মনেই একটা প্রশ্ন—কবে নাগাদ এ ভাইরাসের প্রতিষেধক বাজারে আসবে? কিন্তু যে কোনো রোগের প্রতিষেধক বাজারে ছাড়ার আগে সেটা মানবদেহে প্রয়োগে সম্পূর্ণ নিরাপদ কি না, সেটা নিশ্চিত হতে কয়েক ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা টিকাটি যে দেশ আবিষ্কার করেছে তাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন দেয়।

টিকা আবিষ্কার, এরপর সেটা অনুমোদন নিয়ে বাজারে আসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সময় লাগে এটা নিশ্চিত হতে যে, এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। আবার রোগের বৈশিষ্ট্যের ওপরেও নির্ভর করে যে এর ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে কত সময় লাগবে। এর আগেও যত প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে সেগুলো বাজারে আসতে ৫ থেকে ২৫ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় লেগেছে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে গুটিবসন্ত, র্যাবিস, প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েডের মতো বেশ কয়েকটি জটিল রোগের প্রতিষেধক বাজারে এসেছিল। তবে সে সময় এ প্রতিষেধকের মান পরীক্ষা ও উত্পাদনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি কমিটি আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়ে থাকে। আবার অনেক দেশের নিয়ন্ত্রক                 প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিলে তারা তাদের দেশে প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে পারে। একটি প্রতিষেধক বাজারে আসার আগে চারটি পর্যায়ে এর মান পরীক্ষা করা হয়। সেই ধাপগুলো হলো :

অনুসন্ধান ও গবেষণা পর্যায়

এ গবেষণা সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষাগারে পরিচালিত হয়। বিজ্ঞানীরা এ পর্যায়ে মূলত ভাইরাসের জেনেটিক গঠনসহ অন্যান্য তথ্য বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। এ কারণে তারা পরীক্ষাগারে ভাইরাস বা সংক্রমিত কোষগুলো থেকে প্রোটিন এবং চিনি শনাক্ত করেন, তারপর গবেষণা করেন যে, এ প্রোটিনগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে ব্যবহার করা যেতে পারে কি না। সেসঙ্গে তারা ভাইরাসটি থেকে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অ্যান্টিজেন শনাক্তের চেষ্টা করেন, যার মাধ্যমে ঐ ভাইরাস প্রতিরোধ বা রোগের চিকিত্সায় তা কাজে আসবে। সেসঙ্গে তারা বোঝার চেষ্টা করেন ভাইরাস প্রতিরোধে কত ডোজ প্রতিষেধকের প্রয়োজন হবে।

প্রাক-ক্লিনিক্যাল পর্যায়

গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া সেই প্রতিষেধকটি মানবদেহে পরীক্ষার আগে সেটা পরীক্ষাগারে থাকা ইঁদুর, খরগোশ, ভেড়া কিংবা বানরের শরীরে প্রয়োগ করা হয় এর প্রতিক্রিয়া দেখতে। কারণ নিশ্চিত না হয়ে মানুষের শরীরে এ প্রতিষেধক দেওয়া হলে জীবন হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এছাড়া এ পর্যায়ে ভাইরাসের টিস্যু কালচার ও কোষ কালচার নিয়েও পরীক্ষা করা হয়।

ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়

এ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি সম্পন্ন হয় চার ধাপে। প্রথম ধাপে, স্বল্পসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের ওপর এ প্রতিষেধক বিভিন্ন মাত্রায় দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ২০ থেকে ৮০ জন মানুষের ওপর চালানো এ পরীক্ষায় তিন মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন বয়স, স্বাস্থ্য ভেদে র্যান্ডম কয়েক শ মানুষের ওপর নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হয়। তবে এ পরীক্ষা চালানো হয় ভাইরাসে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষের ওপরে। এর জন্য আট মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

তৃতীয় ধাপে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ অসুস্থ মানুষের ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। এর জন্য দুই থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

লাইসেন্স পাওয়ার পর চতুর্থ ধাপে চলে প্রতিষেধকের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কোনো টিকার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।

অনুমোদন ও উত্পাদন পর্যায়

সব ধাপে প্রতিষেধকটি নিরাপদ প্রমাণিত হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা যে কোনো দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে এর লাইসেন্স বা অনুমোদন নিতে হয়। এরপর এ ভ্যাকসিন বিপুলসংখ্যায় উত্পাদন করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়।—বিবিসি