অ্যাসিড সন্ত্রাস কমলেও নির্মূল হয় নাই। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও অ্যাসিড নিক্ষেপের কারণটা এখনো একই রকম। আগেও প্রেমের প্রস্তাবে কোনো নারী রাজি না হলে, তার সুন্দর মুখ অ্যাসিডে ঝলসে দেওয়া হতো। এই ২০২০ সালে এসেও কিশোরী মেয়ে স্বামীর ঘর করতে চায়নি বলে তার মুখ অ্যাসিডে ঝলসে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত পহেলা অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মাহবুবা খাতুন নামে এক কিশোরী বধূর মুখ অ্যাসিডে ঝলসে দিয়েছেন স্বামী মুরাদ। গত কয়েক মাস ধরে তাদের বনিবনা হচ্ছিল না।
দেশে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা বিগত এক দশকের বেশি সময়ে আশাতীতভাবে কমে এলেও ভয়াবহ এই সন্ত্রাস একেবারে নির্মূল হয়নি। অ্যাসিড সন্ত্রাসে ভুক্তভোগীদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ১৯ জন। অথচ ১৯৯৯ সালে দেশে ৩ হাজার ৪১২টি অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।
অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী, লাইন্সেস ছাড়া অ্যাসিড উত্পাদন, বিক্রি, মজুত ও ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। জেলায় জেলায় জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল থাকলেও অ্যাসিড বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর এর কোনো তদারকি নেই। ফলে অনুমতিপত্র ছাড়াই সারা দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান অ্যাসিড বিক্রি, উত্পাদন ও মজুদ করছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, আইনের শিথিলতা কিংবা সাক্ষী না পাওয়ার কারণে অ্যাসিড নিক্ষেপের প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনায় আসামিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার অ্যাসিড নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ হলেও পুলিশ প্রতিবেদন যথাযথ না হওয়ায় অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে, কিংবা কম সাজা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে অ্যাসিড সন্ত্রাস ব্যাপক হারে কমেছে, তবে নারীর ওপর অন্য অপরাধ বেড়েছে। অ্যাসিডের সহজলভ্যতা রয়েছে। আছে মনিটরিংয়ের অভাব। আবার যারা সার নিয়ে কাজ করেন বা ব্যবসায়ী তাদের কাছেও সহজে দাহ্য এই পদার্থটি পাওয়া যায়। যারা অ্যাসিড নিক্ষেপ করে তাদের কাছে দাহ্য এই রাসায়নিকটি সহজলভ্য। যারাই প্রয়োজনে এটা নিয়ে কাজ করেন তাদের আরো সচেতন হতে হবে। অ্যাসিড যেন চাইলেই অন্য কেউ ব্যবহার করতে না পারে। সতর্কতার সঙ্গে নিরাপদে এই দাহ্য পদার্থটি সংরক্ষণ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, এর যেন কোনো অপব্যবহার না হয়।
অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, করোনাকালে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। এই সময়ে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। যে কারণে অন্য সহিংসতাও বেড়েছে। অ্যাসিড নিক্ষেপ বাড়ার আর একটি কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন হামলাকারীর ‘আত্মতুষ্টি’ কে। তিনি বলেন, সবাই বলছে অ্যাসিড সন্ত্রাস কমে গেছে। এ কারণে মনিটরিং দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে সহজে কেনা-বেচা হচ্ছে অ্যাসিড। তিনি জানান, চলতি বছর জুন পর্যন্ত ১৯টি অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে ছিল ৪৭টি, ২০১৯ সালে ২২টি অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
