গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে জেগে উঠবে

গ্রিক-তুর্কি বিবাদ!

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৬

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খনিজ সম্পদ আহরণ নিয়ে তুরস্ক, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে সাইপ্রাস নিয়ে বিবাদ অনেক দিনের পুরনো ইস্যু। খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ভূমধ্যসাগর এখন দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে জটিলতা বাধার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

পূর্ব মধ্যসাগরীয় দেশ গ্রিস, তুরস্ক ও সাইপ্রাস সাগরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান বিষয়ে নিজেদের অধিকার ছেড়ে দেয়নি। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাবহারিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশগুলো এক রকম অনড় অবস্থানে আছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, এটি বাতাসে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বাড়ায়। অন্যদিকে খনি থেকে আহরণ করা গ্যাস পরিশোধন যথেষ্ট ব্যয়বহুল। বিশ্লেষকদের মতে, বিবাদ এড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামনে যে পথটি খোলা আছে তা হলো স্থগিতাদেশ জারি করা। এর মধ্য দিয়ে তারা দুটি সংকট এড়াতে পারে। একটি হলো পারস্পরিক সংঘাত এড়ানো এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনার ইইউর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভূমিকা রাখা।

ভূমধ্যসাগরের যে অংশ জুড়ে বিবাদের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে তার নাম হেলেনিক ট্রেঞ্চ। এর তলদেশ জুড়ে বিশাল গ্যাস মজুত রয়েছে। ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে জ্বালানি অনুসন্ধান তত্পরতা বর্তমানে নেই বললে চলে। সাগরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের পক্ষ থেকে সেখানে অনুসন্ধান কাজ বন্ধ রেখেছে। গ্যাস সমৃদ্ধ ইজিয়ান সাগরে জ্বালানি অনুসন্ধানের ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে ১৯৭৬ সাল থেকে। ইজিয়ান সাগরের ওপর গ্রিস ও তুরস্কের অভিন্ন অধিকার রয়েছে। এখন যদি পূর্ব মধ্যসাগরে গ্রিস বা তুরস্ক গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে সেটি যে কেবল ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে সম্পাদিত জলবায়ু চুক্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে তা নয়, বরং সাগরের প্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস আহরণের বিষয়টি যথেষ্ট টেকসই নয়। এমন করোনা মহামারির মধ্যে বাজার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় উত্তোলনের ফলে গ্যাসের দাম বেড়েও যেতে পারে। ৪০০ মাইল দীর্ঘ, ১৭ হাজার ফুট গভীর হেলেনিক ট্রেঞ্চে এখনো গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ফ্রান্স, ইতালি ও ক্রোয়েশিয়া সাগরে জ্বালানি অনুসন্ধান বন্ধের একটি ঘোষণা দিয়েছিল, গ্রিস, তুরস্ক ও সাইপ্রাস সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী নিকোলাস হলো আগস্টের শেষ সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। তিনি মনে করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাত্রেঁদ্ধার সরকার যথেষ্ট আন্তরিক নয়। তারা যা বলছে সেটি তারা করছে না। হলো জলবায়ু বিজ্ঞানীদের এই মন্তব্য সমর্থন করেছেন যে, প্যারিস চুক্তি টিকিয়ে রাখতে হলে বিশ্বের মজুত জীবাশ্ম জ্বালানির ৮০ ভাগ মাটির নিচেই রেখে দিতে হবে। তার এই পদত্যাগ ম্যাত্রেঁদ্ধা সরকারের পরিবেশবাদী নীতি বাস্তবায়নের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং ১১টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাগরে জ্বালানি অনুসন্ধান বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যাংকও ২০২১ সালের শেষ নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে। কথা হলো গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনার বিষয়ে পূর্ব মধ্যসাগরীয় দেশগুলোরও দায়িত্ব আছে। এই দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ছাড়া প্রায় সবাই প্যারিস চুক্তিতে সই করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক গ্যাস যার বেশির ভাগটাই মিথেন সেটা আগে যা ধারণা করা হতো পরিবেশের জন্য তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পরিবেশ গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড জানিয়েছে, গত দুই দশকে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ কমলেও বেড়েছে মিথেন নির্গমন। অনুসন্ধানমূলক কাজ, পরিবহন ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকালে প্রচুর মিথেন নির্গত হয়। সে কারণে পরিবেশ রক্ষার্থে অনুসন্ধানমূলক কাজ অবশ্যই বন্ধ রাখা উচিত। এটি পরিবেশের যেমন ক্ষতি করে, তেমনি আর্থিকভাবে খুব লাভজনক হবে না। কারণ গভীর সাগর থেকে গ্যাস তুলে বিক্রি করার সময় খরচ উঠে আসার সম্ভবনা নেই। গ্রিস, তুরস্ক বা সাইপ্রাস এখনই সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের ঘোষণা না দিলেও অদূর ভবিষ্যতে তারা সেটি করতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত এই তিন দেশকে বুঝিয়ে স্থগিতাদেশে রাজি করানো। এটি না হলে দেশ তিনটি আবারও তাদের পুরনো বিবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা আঞ্চলিক স্থিতিকে বিপন্ন করবে।