যশোরের দুঃখগাঁথা ভবদহ আবারও গ্রামের পর গ্রামকে প্লাবিত করে মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার ৭টি উপজেলার ৫৯টি ইউনিয়নের প্রায় ৪০০ গ্রামের ১৫ লাখ মানুষের জীবন ভবদহের অভিশাপে বিপন্ন হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ যশোরের অভয়নগরের আমডাঙ্গা খাল সংস্কার আর টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধারা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অভিশাপের এ গ্লানি থেকে মুক্ত হতে পারবে বলে জানিয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জনমতকে উপেক্ষা করে গত চার বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ‘নামকাওয়াস্তে’ পলি অপসারণের কর্মসূচির মধ্যেই ভবদহের দুঃখ মোচনের ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রামের পর গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়িঘরের কোথাও হাঁটুপানি। কোথাও কোমর পানি। রাস্তা সংলগ্ন প্রতিটি বাসাবাড়িতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যমে বাঁশের সাঁকো। আর দূর গ্রামের বাড়িতে যাবার বাহন নৌকা। পাকাবাড়িতে কোনোরকম থাকার ব্যবস্থা থাকলেও কাঁচাবাড়িতে মানুষের বসবাস রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। সেখানে একটি ঘরে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে একসঙ্গে বসবাস। ছোট ছেলে-মেয়েদের পানিতে পড়ে যাবার ভয়ে কখনো গামছা দিয়ে কোমরে বেঁধে রাখা হয়। কখনো আবার শিকলে বাঁধা পড়ে অবুঝ জীবন। লজ্জাশরমের বাছবিচার না করে ঘরের পাশেই সাড়া দিতে হয় প্রকৃতির ডাকে। আয়রোজগারহীন মানুষের খাদ্যাভাবের পাশাপাশি খাবার পানির সংকট তীব্র। গোখাদ্যের অভাব আর অসুখ-বিসুখে গরু-ছাগলের মৃত্যুও বেশ। ডহর মশিহাটি গ্রামের অজিত মন্ডলের স্ত্রী বিজলী মন্ডল জানান, তার স্বামী ঘেরে কাজ করেন। যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে ৫ জনের সংসার চলে না। সাঁকো দিয়ে বাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। একবার তার নাতি পানিতে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে কোনোরকমে বাঁচে। প্রতিমা বিশ্বাস বলেন, বাথরুম পুরোটাই জলে ডোবা। ঘরের পাশে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে। অভয়নগরের আমডাঙ্গা খালে দেখা যায়, সেখানকার গেটের মুখ অনেক উঁচুতে। নির্মাণত্রুটির কারণে সেখান থেকে পানি বের হচ্ছে ক্ষীণ গতিতে। ভবদহের ২১ ভেন্ট স্লুইসগেটের দুইপাশে অস্থায়ীভাবে অপসারণ করা পলির স্তূপ রাখা আছে। ভবানীপুরের দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক বলেন, পলি কেটে পরিষ্কার করলে ২-৩ দিনেই আবার পলি এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পায়রা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মনি শংকর রায় বলেন, এস্কেভেটর দিয়ে পলি যেভাবে কাটা হয়, তাতে লাভ হয় না কিছুই। ভবানীপুরের ৮০ বছরের বৃদ্ধ নিরোদ চন্দ্র সরকার বলেন, ড্রেজার দিয়ে কাটলেও লাভ হবে না। টিআরএম ছাড়া কোনো গতি নেই।
সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিকাশ রায় বলেন, তার এলাকাবাসী গত তিন-চার মাস ধরে সম্পূর্ণ পানির নিচে। আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি এবং টিআরএম কার্যক্রম হাতে নিয়ে মানুষকে বাঁচানো হোক। পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমডাঙ্গা খালে ব্রিজ নির্মাণের সময় ত্রুটির কথা বলা হলেও বিএডিসি শোনেনি। এখন জরুরিভিত্তিতে ব্রিজের নিচু এলাকা প্রশস্ত করে খাল চওড়া করা হবে। এজন্য এক সপ্তাহের মধ্যে টেন্ডার হবে। তিনি বলেন, গেটকে ফাংশনাল রাখতে ২০১৬ সালে ভবদহের ২১ ভেন্টে পাইলট চ্যানেল চালু করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে অপচয় মনে হলেও এটা করা না হলে এখানকার রাস্তা ডুবে যেত। টিআরএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর পক্ষে-বিপক্ষে মানুষ আছে। টিআরএম কোনো স্থায়ী সমাধানও না। আবার এটা করা হলে বিল-জলাশয় ভরাট বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার এখানকার বিলে ধান-মাছ দুই-ই হচ্ছে। তবে জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসনে নতুন পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন বিল ও নদীতে পলি অপসারণের জন্য পাইলট চ্যানেল খনন কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৯৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার করালগ্রাস থেকে মানুষের মুক্তি মেলেনি।
