প্রজ্বলিত কৃষি খাত, আলোকিত অর্থনীতি

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:৫০

পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য করোনা মহামারির ব্যবস্থাপনা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। তবু কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত কার্যক্রম সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

এই করোনাকালে উপলব্ধ বিষয় হলো কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান রক্ষাকবচ। সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সব ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন লকডাউনে ঘরবন্দি, তখনো মাঠে কর্মব্যস্ত ছিলেন বাংলার কৃষকেরা। মাঠে ফলিয়েছেন সোনার ফসল। আর সেই ফসলই সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা। যদিও করোনা মহামারির কারণে কৃষকের উত্পাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে বহু সমস্যা পোহাতে হয়েছে। সারা দেশ লকডাউনের আওতায় থাকায় পরিবহন, বাজার—সবকিছুই বন্ধ ছিল, ক্রেতারা ছিল ঘরবন্দি। অনেকের ফসল নষ্ট হয়েছে, পচে গেছে। আবার কেউ কেউ ন্যায্যমূল্যের চাইতেও অনেক কম মূল্যে ফসল বিক্রি করেছে। করোনাকালে বাংলাদেশের কৃষি খাতের এই অবদান আবারও মনে করিয়ে দিয়ে গেছে, ‘কৃষিই একমাত্র ভরসা’। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উজ্জ্বল  উদাহরণ রেখেছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-২০১৭ (বিবিএস) অনুযায়ী এদেশের শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অর্থনীতির বুনিয়াদ কৃষি খাতে নিয়োজিত। একক খাত হিসেবে  জিডিপিতেও এর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ আয় আসে এ খাত থেকে। কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ  ২০১৭ (বিবিএস) অনুযায়ী মাত্র ৮৫ দশমিক ৭৭ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমি থেকে ১৬ কোটিরও অধিক মানুষের অন্নের সংস্থান হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রের জন্য সত্যিই ঈর্ষণীয়। আমাদের কৃষিব্যবস্থায় কিছু চিরাচরিত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও বিজ্ঞান প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্তমানে এই ব্যবস্থা এখন এক আশাজাগানিয়া সমৃদ্ধির স্তরে উঠে এসেছে।

এই করোনা মহামারিকালেই ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য জিডিপির ২ দশমিক ৮৯ শতাংশ হিসেবে ১৬ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে (মোট বরাদ্দ ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা)। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ (মোট বরাদ্দ ২৮ লাখ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা)। অর্থাত্, ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ (মোট জিডিপির ১৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ)। অর্থাত্, জাতীয় বাজেট যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার চেয়েও দ্বিগুণ বেশি হারে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকসমাজকে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। সরকার যদিও উত্পাদনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমে কৃষককে প্রণোদনাসহ নানাভাবে সেবা প্রদান করছে। ঘোষণা করছে নানা প্যাকেজও। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনা সুষম না হওয়ায় উত্পাদন বাড়লেও তারা সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজশের কারণে অধিকাংশ সময় ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। এ কারণে কৃষকেরা হতাশ ও চাষাবাদবিমুখ হয়ে পড়েন। দেশের এই দুর্যোগকালে ফসলের যে বাজারদর, তা অব্যাহত রাখতে পারলে কৃষকদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। তাই অধিক ফসল উত্পাদন ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকেরা যাতে উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান তার সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক ঘোষণায় এক ইঞ্চি জমিও ফেলে না রাখার আহ্বান জানান।

করোনা পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও অনন্য এক রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবমতে এবার (২০২০-২১) প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। অভূতপূর্ব এই সাফল্যে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য। কৃষির এই সাফল্য ধরে রাখতে প্রয়োজন সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কৃষিবান্ধব নীতিমালা ও বাজেটের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। এতেই ত্বরান্বিত হবে কৃষির উত্পাদন। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির সময়েও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রয়াস নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। জাতির এই গৌরবগাথা আরো শাণিত করার প্রয়াসেই প্রণয়ন করা হয়েছে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট। আশা করা যায় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যত্ পথপরিক্রমায় এই প্রস্তাবিত বাজেট সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হবে আরো শক্তিশালী। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, বাঙালির আজন্ম লালিত স্বপ্নের উন্নত ও গৌরবোজ্জ্বল সোনার বাংলা বিনির্মাণে। জাতি হিসেবে আমরা উন্নীত হব বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়