পত্রিকার পাতা উলটালে কিংবা ওয়েব নিউজ প্রোটোকলে ব্রাউজ করলেই হত্যা, দুর্ঘটনা, চুরি, ডাকাতি, বিশ্বাসঘাতকতার মতো বিষয়গুলোর খবর বারবার চোখে পড়ে এবং তারপর জীবন ও জগত্ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বে ইতিবাচক মনোভাব জন্মানোর জন্য কত কি আয়োজনই না করা হচ্ছে! কারণ একটাই জীবন। জগত্ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব না রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভবপর হয় না। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষই নেতিবাচক চিন্তাধারা নিয়ে এবং জগতে শুভ কিছুর প্রতি বিশ্বাস না রেখেই বেঁচে আছেন। কিন্তু সে জীবনে সফলতা কোথায়? সে জীবনে প্রাপ্তির জায়গাটাও বা কোথায়? এসব নিয়ে এখন না ভাবলে চলে না। একবিংশ শতাব্দীর তুমুল প্রতিযোগিতার যুগে মানুষকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় আবার তার ভেতর দিয়ে সুন্দর ও কল্যাণকর ভাবনা মনে পোষণও করতে হয় তবেই সাফল্য আসে।
অনেকে ভাবেন ইতিবাচক মনোভাব রাখা সম্ভব নয় যখন চারপাশের জগত্টাকে সাধারণ চোখে দেখলেই তো বোঝা যায় কত জটিলতায়, কত সংকটে আছে সবাই। চাকরি নেই, অল্পসংখ্যক পোস্টে লাখ লাখ মানুষের আবেদন, মামা-চাচা আর টাকার জোরে চাকরি মেলে, যাদের তা নেই তাদের রেজাল্টেও কিছু যায় আসে না, সারা মাস পরিশ্রম করে অল্প টাকা মাইনে, রাস্তায় চলাচলে বিপদ, বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার—আরো কত কত অসংগতি! এতসবের ভেতর দিয়ে কীভাবে একজন মানুষ তার জীবন নিয়ে, তার ভবিষ্যত্ এবং চারপাশের পৃথিবী নিয়ে আশাবাদী হতে পারে? প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত সামাজিক জীবন, মাটিক্ষয়, ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যায় মানুষ আজ দিশেহারা—এসবের ভেতর দিয়েও কি ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখা সম্ভব? প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। মানতে বাধা নেই যে এসবের ভেতর দিয়ে সুন্দর ও কল্যাণময় জীবনের স্বপ্ন দেখা সহজ নয় কিন্তু পৃথিবীতে কি কেবল এসবই ঘটছে? এর উলটোপিঠের চিত্রও কি দৃশ্যমান আছে।
আমাদের কাছে অনুপ্রেরণাদায়ক অসংখ্য খবরও আছে। চাকরি নেই অথচ তার ভেতর দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে, সংগ্রামমুখর জীবনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অনেকে শূন্য থেকে হয়ে উঠছে দৃষ্টান্ত, কেউ কেউ চাকরির আশা বাদ দিয়ে গ্রামে গিয়ে গড়ে তুলছে কৃষি খামার, চাষাবাদ করছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে করছে কৃষিবিপ্লব, ক্ষুদ্র ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করে অনেকেই হয়ে উঠছে সেরা উদ্যোক্তা, সন্ত্রাসবাদের বিপরীতে কেউ কেউ মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে মানুষের জন্য সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়ে, শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ করে এবং ছিন্নমূল মানুষকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করার জন্য অনেকেই ক্ষুদ্র পর্যায় থেকে নিচ্ছে নানা উদ্যোগ। এভাবে পৃথিবীর জন্য কাজ করে যাচ্ছে লাখো মানুষ। সেগুলো কি সুন্দর নয়? পবিত্র নয়? কল্যাণকর নয়? তাই একথা মানতে আমাদের দ্বিধা করা উচিত নয় যে জগতে ভালোর বিপরীতে খারাপ, সুন্দরের বিপরীতে কুিসত এবং কল্যাণের বিপরীতে রয়েছে অকল্যাণ। এক দল প্রাণপণে জগেক সুন্দর করে নির্মাণে নিমগ্ন আবার অন্য দল জগেক ধ্বংসের উন্মাদ নেশায় আসক্ত। এই দুই নিয়েই জগত্, এই দুই নিয়েই জীবন।
আমরা যদি আমাদের জীবন নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে পারি, আমরা যদি আমাদের বর্তমান এবং চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি আস্থা রাখতে পারি তবে সেটা আমাদের নিঃসন্দেহে সাফল্য এনে দিতে পারবে। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসুক আর না আসুক ঐ ইতিবাচক মনোভাবটা একটা প্রবল প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য, সুখী হওয়ার জন্য এই প্রেরণা এক মহামূল্যবান পাথেয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা এবং সেটি ধরে রাখার অভ্যাসটা গড়ে তোলা।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
