‘অর্ধেক জীবন’ গ্রন্থে প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখিয়াছেন, সত্তরের দশকে তিনি যখন আমেরিকায় ছিলেন তখন তাহার এক আমেরিকান প্রতিবেশী প্রায় নিয়মিত তাহাকে গাড়ি চালানো শিখাইবার চেষ্টা করিতেন। ঐ আমেরিকান ভদ্রলোকের আশা ছিল, সুনীল গাড়ি চালানো শিখিলে নামমাত্র মূল্যে তাহার পুরাতন গাড়িটি সুনীলের নিকট বিক্রয় করিতে পারিবেন। ইহাতে ঐ ভদ্রলোক তাহার পুরাতন গাড়িটি ডাম্পিংয়ে দেওয়ার খরচও বাঁচাইতে পারিবেন। কারণ, উন্নত দেশে চাহিলেও কেহ যে কোনো জায়গায় তাহার গাড়ি বা ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র ফেলিয়া দিতে পারে না। কেহ যদি নদী বা জলাশয়ে গোপনেও কিছু ফেলিয়া দেন, তাহা হইলে পরবর্তী সময়ে ঐ জলাশয় হইতে তাহার ঐ জিনিসের কোড নম্বর ধরিয়া তাহাকে ঠিকই পাকড়াও করা হয়। জরিমানাও আদায় করা হয় আরো অধিক; কিন্তু দেশটির নাম যদি বাংলাদেশ হয়, তাহা হইলে এই সকল কোনো ব্যাপারই নয়। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি ছোট্ট সংবাদ বলিয়া দিতেছে নদী বা জলাশয়কে আমরা স্রেফ নর্দমা মনে করি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন খাল পরিষ্কার করিতে গিয়া পাওয়া গিয়াছে পরিত্যক্ত ভাঙা ফ্রিজ, গাড়ির টায়ার, সুটকেস, চেয়ার, পানির বোতল এবং ডাবের খোসা। নগরবাসীর ফেলিয়া দেওয়া এই সকল আবর্জনায় ভরিয়া গিয়াছে খালগুলি।
রাজধানীবাসীর এহেন অসচেতনতা লইয়া গত বুধবার মিরপুরে গোদাবাড়ী খালপাড়ে এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীরও আয়োজন করিয়াছে ডিএনসিসি। ইহাতে রাজধানীর প্রায় ৯টি খাল হইতে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা প্রদর্শন করা হয়। বিভিন্ন খাল হইতে উদ্ধার হওয়া আবর্জনার তালিকা আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয়, নগরে বাস করিলেও ‘নাগরিক’ হইবার মতো পরিশীলিত অভিধা আমাদের জন্য নহে। দেখা গিয়াছে, ৯টি খাল হইতে শতাধিক জাজিম, ২০০ ট্রাক ডাবের খোসা, টিভির বাক্স, বালিশ, ভাঙা ফ্রিজ, সুটকেস, ভাঙা চেয়ার ও কমোড উদ্ধার করা হইয়াছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছে, খাল, ডোবা-নালা পরিষ্কার অবস্থায় পাওয়া না গেলে জরিমানা করা হইবে। প্রশ্ন হইল, কাহাকে জরিমানা করা হইবে? উদোর পিণ্ডি তো বুধোর ঘাড়ে চাপানো যায় না। রাতের অন্ধকারে তো যে কেহ পরিত্যক্ত জিনিস খালে ফেলিয়া দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন খুব সহজেই বিভিন্ন পয়েন্টে সিসিটিভি লাগাইতে পারে। এবং সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙাইয়া দিতে পারে। কেহ যদি বুঝেন যে, তাহার উপর সিসিটিভির নজরদারি আছে এবং তিনি অপরাধ করিয়া পার পাইবেন না, তাহা হইলে তিনি সেই দুষ্কর্ম করিতে দ্বিতীয় বার ভাবিবেন নিশ্চয়ই। কে হায় জানিয়াশুনিয়া জরিমানা গুনিতে ভালোবাসে!
আমরা দেখিতে পাই, যেই ব্যক্তি দেশে নিয়মের তোয়াক্কা করেন না, উন্নত দেশে গিয়া সেই ব্যক্তিটিই অক্ষরে অক্ষরে নিয়মকানুন মানিয়া চলেন। তাহার কারণ, ঐখানে অনিয়ম বা দুষ্কর্ম করিয়া পার পাওয়া যায় না। আমাদের সমাজেও যদি সকলের ভিতরে এই বার্তা প্রোথিত করা যায় যে, অপকর্ম বা অপরাধ করিলে তাহার শাস্তি পাইতেই হইবে, তবে তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় অপকর্মের লাগাম টানিয়া ধরা সম্ভব হইবে। আসলে, পৃথিবীর সকল মানুষই জন্মগতভাবে স্বেচ্ছাচারী, তাহাকে আইনের ডান্ডা দিয়াই লাইনে রাখিতে হয়।
