কীভাবে গড়ে ওঠে ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৬

জয়শ্রী দাস

তখন কলেজে পড়ি, বাড়ির সবার ছোট, ভীষণ ডানপিটে, প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেলে করে শহরের এ মাথা-ওমাথায় ঘুরে বেড়াতাম। সেদিন ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। একটা অনুষ্ঠান শেষে আমরা ছয় জন নদীর পাড়ে হাঁটতে ছিলাম। তখনো দিনের আলো ছিল। একটু শীতের হিমেল হাওয়া তখনো অবশিষ্ট ছিল। সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠল, খানিকটা দূরে ধানখেত ছিল, সেখান থেকেই হয়তো কোনো একটা গ্রামের শুরু, কেমন একটা অন্ধকার ভাব, আমাদের মধ্যে কে যেন বলে উঠল— সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি চল। আমরা বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াই। হঠাত্ করেই ধানখেত থেকে মেয়ের চিত্কার শুনতে পেলাম। আমরা দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, চৌদ্দ কি পনের বছরের এক মেয়েকে এক নরপশু ধানখেতের মধ্যে চেপে ধরে আছে! বন্ধুরা মুহূর্তের মধ্যে লোকটিকে ধরে মারতে শুরু করে দিল...। মেয়েটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, মামাবাড়ি থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম..., হঠাত্ কোথা থেকে এই লোকটি এসে আমাকে জোর করে ধরে ধানখেতের মধ্যে নিয়ে যায়..., লোকটিকে কিছুক্ষণ উত্তমমধ্যম দিয়ে ধানখেতে ফেলে আসি এবং মেয়েটিকে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি আমরা। আমার মনে তখন একটা প্রশ্ন জাগে, যে লোকটি এই অন্যায় কাজটি করছিল, সেকি কোনো মায়ের পেটে জন্মগ্রহণ করেনি?

আসলে ওরা কারা? যারা নারীদের বিভিন্নভাবে শ্লীলতাহানি করে! তাদের কি পরিবার-সমাজ বলে কিছুই ধারণা নেই। অসুস্থ মস্তিষ্ক কীভাবে তৈরি করে তারা। ২০১৯ সালের ৫ জুলাই টিভির একটি খবরের দিকে চোখ গেল, ঢাকার ওয়ারীতে ছয় বছরের একটি শিশু সায়মাকে ধর্ষণের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের সবার হয়তো মনে আছে—চলন্ত বাসে ইবনেসিনা হাসপাতালের নার্স তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা। সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ, খাগড়াছড়ির প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণ, সাভারে ধর্ষণসহ আরো কয়েক জায়গায় ঘটেছে এমন ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৭৫ নারী। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৭ নারী। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৪৩ নারী। আত্মহত্যা করেছেন ১২ নারী। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

কয়েক দিন আগে তেজগাঁও রেলস্টেশন দিয়ে যাচ্ছিলাম, রেল আসায় আমার গাড়ি জ্যামে আটকে গেল, ভাবলাম গাড়ি থেকে একটু নামি। নামলাম, একটু পাশেই দেখি একটা ভ্যানগাড়িতে চারটি লোক গোল হয়ে বসে মোবাইল ফোনে কী যেন দেখছে। আমি কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি তারা পর্নো সাইট দেখছে। তাদের মনোযোগে আমার উপস্থিত টের পায়নি। আমি দূরে সরে এলাম। গাড়িতে উঠে বসলাম। জ্যাম ছেড়ে দিল। গাড়ি চলতে লাগল। আমার মনে হলো—এই দৃশ্য শুধু ঢাকা শহরে নয়, গ্রামগঞ্জেও স্মার্টফোনের কল্যাণে এটি প্রচলিত দৃশ্য। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা কারণ হিসেবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ধরতে পারি:

ক. মা-বাবার অসচেতনতা; খ. মাদকাসক্তি এবং যৌন উত্তেজক বিভিন্ন ওষুধ সেবন; গ. হিন্দি ক্রাইম সিরিয়ালের প্রতি এক শ্রেণির মানুষের আসক্তি; ঘ. বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন দেশের সিনেমাগুলোতে আবেগ, ভালবাসার পরিবর্তে ধর্ষণ, উত্তেজক, খুন-গুমের দৃশ্য বেশি বেশি দৃশ্যমান করা; চ. কোনো একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর প্রথম বেশ কয়েক দিন মিডিয়া তোলপাড়, এরপর কী হলো সে বিষয়টা নিয়ে আর কারো তেমন মাথা ব্যথা নেই; ছ. কিশোর গ্যাং; জ. মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অথবা এভাবে বলা যায়, মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহার না করা; ঝ. পর্নো সাইটগুলোতে আসক্তি ঞ. রাজনীতি শব্দের সঠিক অর্থ না জানা; ট. ধর্মীয় অনুশাসনগুলো যথাযথভাবে না পালন করা; ঠ. ধর্ষণের ঘটনার পর সালিশ করা।

পার্বত্য এলাকা থেকে সমতল এলাকা যেখানেই যাই সেখানেই সালিশের প্রথা; কিন্তু ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ, এটি কখনোই সালিশযোগ্য নয়। এর বিচার হবে আদালতের মাধ্যমে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যে ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হবেন তাকে ডাক্তারি পরীক্ষা না করলে এতে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যায়; কিন্তু ধর্ষিতাকে প্রায়ই নির্দিষ্ট সময়সীমার পরে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য উপস্থিত করা হয়।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও গবেষক