গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান- চুম্বক

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২০, ১৯:৩৯

মাধব রায়

সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

অণু আর বিন্দুর ঝগড়ার মাধ্যমে আপাতত গল্পের আসর শেষ হলেও কিছুক্ষণ পরেই আবার জমেছে। এবারে তানভীর সাহেবকে ঘিরে। দুপুরের ঘুমের পর তিনি যখন দেখলেন এদের গল্প শেষ হয়নি, তখন চোখে পানি দিয়ে এসে বসলেন। কমলাকে বললেন— বৌদি, এবারে একটু চা হলে ভালো হয়।

দিচ্ছি, বললেন কমলা। আনজুমকে বললেন— ভাবি আপনাকেও দিই ?

না বৌদি, আমি একটু পরে খাবো। এখন ইচ্ছে করছে না। আনজুম বারান্দায় চলে গেলেন।

বিন্দু বলল— আঙ্কেল, অণুদা আমার সাথে খালি ঝগড়া করে।

ও মা, তাই নাকি ! বললেন তানভীর সাহেব। কেন অণু, তুমি বিন্দুর সাথে খালি ঝগড়া করো কেন ?

ট্রেতে করে চায়ের কাপ আনতে আনতে কমলা বললেন— হ্যাঁ, তানভীর ভাই এরা দুই ভাই বোন যেন উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু।

আকাশ বলল— না মামি। উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু হলে তো খালি আকর্ষণ করত। কারণ চুম্বকের উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে আর একই জাতীয় মেরু বিকর্ষণ করে।

তানভীর সাহেব হেসে বললেন— ওগুলো ছোট ভাইবোন মিলে একটু আধটু করেই থাকে। বড় হলে দেখবেন চলে গেছে।

বিন্দু বলল— অণুদার কাছে একটা চুম্বক আছে। লোহাতে লেগে থাকে।

অণু ভেংচি কেটে বলল— লোহাতে লেগে থাকে, সেটা বল, সেই ঘটনাটা...

তানভীর সাহেব হেসে বললেন— কোন ঘটনা ?

সীমা বলল— অণু যেদিন চুম্বক শলাকা কিনে আনল, সেদিনই বিন্দু ভেঙ্গে ফেলেছে।

বিন্দু মাথা নিচু করে চুপ করে থাকল। লজ্জা পেয়েছে। আমি ইচ্ছে করে ভাঙ্গিনি আঙ্কেল। হাত থেকে পড়ে গেছে।

তানভীর সাহেব বললেন— আচ্ছা ঠিক আছে। হাত থেকে পড়ে ভাংলে অসুবিধা নেই। ইচ্ছে করে না ভাংলেই হলো। আচ্ছা ভাঙ্গার পরে চুম্বক শালাকাটা কয় টুকরা হলো ?

দুই টুকরা, বলল বিন্দু।

তাহলে একটা উত্তর মেরু আর একটা দক্ষিণ মেরু...

আকাশ বলল— না আঙ্কেল, চুম্বকের উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু আলাদা করা যায় না। প্রতিটি টুকরাতেই আবার উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু সৃষ্টি হয়ে যায়।

ঠিকই বলেছ। তানভীর সাহেব বললেন।

আচ্ছা আঙ্কেল, চুম্বক নাকি এক রাখালের আবিষ্কার ? আকাশের প্রশ্ন।

বিন্দুর চোখ বড় হয়ে উঠল। মজার গল্পের গন্ধ পেলো সে।

তানভীর সাহেব বিন্দুর গালে হাত বুলিয়ে বললেন— হ্যাঁ, মজার গল্প আছে চুম্বক নিয়ে। এশিয়া মাইনরে ম্যাগনেশিয়া নামে একটা প্রদেশ ছিল। সেখানে একজন রাখাল বালকের নাম ম্যাগনাস। সারাদিন মাঠে মাঠে মেষ চরিয়ে সন্ধ্যায়  বাড়ি ফিরে আসত। মেষকে গুতা দেবার জন্য তাঁর লাঠির মাথায় একটা লোহা লাগানো  ছিল। একদিন সে আরো দেখল, তার লাঠির মাথার লোহাটি একটা পাথরে লেগে আছে। টেনে উঠাতে জোর খাটাতে হচ্ছে। সে দেখল পাথরটি শুধু লোহাকেই টেনে ধরছে। অন্য কিছুকে টানছে না। পরে ম্যাগনাসের নামানুসারে পাথরটির নাম হলো ম্যাগনেট। ম্যাগনেটের প্রতিশব্দ হলো চুম্বক।

আকাশ বলল— চুম্বক কি পদার্থ, নাকি শক্তি ?

তানভীর সাহেব বললেন— পদার্থও আবার শক্তিও।

কী রকম ?

যে পাথরটার কথা বললাম, এর ভর আছে, আয়তন আছে, কাজেই এই পাথরটা পদার্থ। আবার চুম্বকের আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে। আকর্ষণ একটি বল। বল দিয়ে কাজ করা যায়। কাজেই চুম্বকের কাজ করার সামর্থ্য আছে। অতএব চুম্বক এক প্রকার শক্তি। কাজেই চুম্বক নামের পাথরটি পদার্থ, আর চুম্বক এক প্রকার শক্তি।

কিন্তু চুম্বকের মেরুকে উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু বলা হলো কেন ? একে তো পূর্ব মেরু-পশ্চিম মেরুও বলা যেত।

অণু বলল— এটিও জানিস না। চুম্বককে মুক্তভাবে ঝুলিয়ে রাখলে এটি উত্তর দক্ষিণ বরাবর ঝুলে থাকে। এর জন্য এর উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু। প্রাচীনকালে জাহাজের নাবিকগণ গভীর সমুদ্রে দিক নির্ণয়ের জন্য চুম্বক শলাকার এই ধর্মকে কাজে লাগাত। এই জন্য প্রাকৃতিক চুম্বককে সন্ধানী পাথর বলা হতো।

রেখা বলল— আঙ্কেল, চুম্বক তো মানুষও বানাতে পারে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, মানুষ যে চুম্বক বানাতে পারে তাকে বলা হয় কৃত্রিম চুম্বক। আর প্রকৃতিতে যে চুম্বক পাওয়া যায়, সেটি প্রাকৃতিক চুম্বক।

চন্দ্রা বলল— আঙ্কেল, চুম্বক কেন উত্তর দক্ষিণে মুখ করে থাকে।

তানভীর সাহেব বললেন— তোমরা তো জানো, পৃথিবী একটি বিরাট চুম্বক। পৃথিবীর উত্তর মেরুতে ভূ চুম্বকের দক্ষিণ মেরু আর পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে ভূ চুম্বকের উত্তর মেরু লুকানো আছে বলে কল্পনা করা হয়। আর চুম্বকের বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। যার ফলে আমরা যদি একটা চুম্বক শলাকা ঝুলিয়ে রাখি, তাহলে ঝুলানো চুম্বকের উত্তর মেরু ভূ চুম্বকের দক্ষিণ মেরু অর্থাত্ পৃথিবীর উত্তর মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। আর ঝুলানো চুম্বকের দক্ষিণ মেরু ভূ চুম্বকের উত্তর মেরু বা পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। ফলে আমাদের চুম্বকটা পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ঝুলে থাকে।

বিন্দু বলল— আঙ্কেল আমি দেখেছি, চুম্বকের কাছে লোহার গুড়া আনলে শুধু দুই প্রান্তে লেগে থাকে। মাঝখানে লোহার গুড়া লেগে থাকে না।

হ্যাঁ, চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা এর দুই প্রান্তে বেশি এবং মধ্যখানে কম। আরো লক্ষ্য করলে দেখতে পারো, আকর্ষণ ক্ষমতা ঠিক এর প্রান্তবিন্দুতে নয়। একটুখানি ভিতরে। অর্থাত্ দুই প্রান্ত থেকে একটুখানি ভিতরের দিকে দুটি মেরু NS অবস্থিত। দুই মেরুর দৈর্ঘ্যকে আমরা বলি চৌম্বকদৈর্ঘ্য। একে  দিয়ে লিখি। আর দুই প্রান্তের দৈর্ঘ্যকে বলা হয় জ্যামিতিকদৈর্ঘ্য। চৌম্বকদৈর্ঘ্য জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের 0.85 গুণ।

অণু বলল— আচ্ছা আঙ্কেল, কৃত্রিম চুম্বক কি প্রাকৃতিক চুম্বকের মতো শক্তিশালী হয় ?

সুন্দর প্রশ্ন করেছো তুমি, কৃত্রিম চুম্বক প্রাকৃতিক চুম্বকের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। তবে কৃত্রিম চুম্বক প্রাকৃতিক চুম্বকের মতো স্থায়ী হয় না। তাই বর্তমানে প্রাকৃতিক চুম্বক ব্যবহার না করে কৃত্রিম চুম্বকই ব্যবহার করা হয়।

চুম্বক কী কাজে লাগে আঙ্কেল ? বলল রেখা।

অনেক কাজে। যেমন ধরো বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, কলিংবেল ইত্যাদিতে।

সব কাজেই কৃত্রিম চুম্বক ব্যবহার করা হয় ?

 

 

হ্যাঁ। প্রাকৃতিক চুম্বক দিয়ে এতোসব শক্তিশালী কাজ করা যাবে না। কৃত্রিম চুম্বক আবার দুই ধরনের। অস্থায়ী বা কোমল চুম্বক এবং স্থায়ী বা কঠিন চুম্বক। চৌম্বক পদার্থকে কোনো চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে...

চৌম্বকক্ষেত্র কী আঙ্কেল ? বিন্দু প্রশ্ন করে।

চৌম্বকক্ষেত্র হলো কোনো চুম্বকের চতুর্দিকে যে অঞ্চল জুড়ে চুম্বকের প্রভাব বিদ্যমান থাকে, সেই অঞ্চল। বললেন তানভীর সাহেব— চৌম্বকপদার্থকে কোনো চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে আনা হলে সেটি চুম্বকে পরিণত হয়। আবার চৌম্বকক্ষেত্রটি সরিয়ে নিলে যদি চৌম্বকপদার্থের চুম্বকত্ব চলে না যায়, তখন তাকে স্থায়ী চুম্বক বলে। স্থায়ী চুম্বক আবার দুই ধরনের। সংকর চুম্বক এবং সিরামিক  চুম্বক। সংকর ধাতু যেমন— লোহা, নিকেল, কোবাল্ট, তামা, অ্যালুমিনিয়ামের মিশ্রণে এই চুম্বক তৈরি করা হয়। লোহার সংকরে কার্বনের পরিমাণ শতকরা 0.8 ভাগের বেশি থাকলে তা স্থায়ী চুম্বক তৈরি করে। আবার লোহার অক্সাইড ও বেরিয়াম অক্সাইডের মিশ্রণে তৈরি ফেরাইট নামের এক ধরনের যৌগিক পদার্থ দিয়ে তৈরি চুম্বককে সিরামিক চুম্বক বলা হয়।

এই চুম্বক কী কাজে লাগে ?

সিরামিক চুম্বক ব্যবহূত হয় টেপরেকর্ডার এবং কম্পিউটারের মেমোরি ফিতায়।

আনজুম বারান্দা থেকে চলে এসেছেন। তিনি বললেন- কী নিয়ে এতোক্ষণ গল্প ? বিন্দু বলল— চুম্বক।

কমলা ট্রেতে করে আনজুমের জন্য চা নিয়ে এলেন, সাথে একটা প্লেটে চানাচুর।

তানভীর সাহেব বললেন— বৌদি, আমিও খাবো।

আনজুম বললেন— তুমি না এখন চা খেলে ?

তানভীর সাহেব হাসলেন।