বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যই কি ফিলিস্তিনের কাল?

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩৪

মো. শহীদুল ইসলাম

চার বার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, আরবদের পরাজয় এবং বর্তমান বাস্তবতায় এটা স্পষ্ট যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র নয় বরং আলোচনার টেবিলই কেবল সমাধান আনতে পারবে। কিন্তু আলোচনার টেবিল প্রস্তুত করবে কে? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজ স্বার্থে যে কোনো অমানবিক কাজকে বৈধতা প্রদান, প্রয়োজনে অপকর্মে সহায়তার নজির অসংখ্য রয়েছে। আর ইসরাইলি বর্বরতা অনেক দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান হওয়ার কারণে বৈশ্বিক রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের চোখে হয়তো পড়ছে না অথবা তারা না দেখার ভান করে আছেন। আন্তর্জাতিক আইনকানুন অমান্য করে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইল যে বর্বরতা চালাচ্ছে, যেভাবে ফিলিস্তিনিদের ঘড়বাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, তা বিশ্বমোড়লদের নজর কাড়তে পারছে না।

মুসলিমদের পবিত্র স্থান বায়তুল মুকাদ্দাস জেরুজালেমে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিস্তিনি সংকট সমাধানের একটা ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৬৯ সালে যখন বায়তুল মুকাদ্দাসে ইসরাইলিরা আগুন লাগায়, এর ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ওআইসি। অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।

ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বেশি যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তা হচ্ছে ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনের নির্বাচন। গাজার নিয়ন্ত্রণকারী হামাস ও পশ্চিমা তীর, রামাল্লা ও জেরিকো নিয়ন্ত্রণকারী ফাতাহের মধ্যে তখন ব্যাপক দ্বন্দ্ব বাধে। দুটি দল দুই অংশ শাসন করতে থাকে। একদিকে যেমন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বিঘ্ন হয়, অন্যদিকে হামাসকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত করায় অনেক দেশই সহযোগিতা করতে পারেনি।

ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই এ সময় বিভক্ত হয়ে পড়ায় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম বিঘ্নিত হয়। দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি শক্তিশালী হয়। 

ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত রেজা শাহের পতনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠা পায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানভীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে শক্তিশালী করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তথাকথিত আরব বসন্ত যেমন অনেক ক্ষমতাধর দেশের শাসকদের পতন ত্বরান্বিত করেছে, একই সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে অভ্যন্তরীণ সংঘাত। এতে একদিকে যেমন ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে দৃষ্টি অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত করেছে, একই সঙ্গে ইরান তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেনসহ আরো অনেক দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। আর ইরানের উত্থানই উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরাইলকে কাছাকাছি এনেছে। এমন কিছু কিছু দেশ আছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির জন্য ইসরাইল নয়, ইরানকেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। আর এই মনে করায় ইসরাইল-আরব সখ্য ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। এর সর্বশেষ ফলাফল হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরাইলের শান্তিচুক্তি।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে দুটি উপসাগরীয় দেশের শান্তিচুক্তি নতুন করে ফিলিস্তিন সংকটকে সামনে এনেছে। সদ্য শেষ হওয়া জাতিসংঘের অধিবেশনেও মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে।

সত্যিকার অর্থেই ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। আশার কথা হচ্ছে, হামাস ও ফাতাহের মধ্যে তুরস্কের রাজধানী আংকরায় এক আলোচনার মাধ্যমে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফিলিস্তিনে সাধারণ নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে যে এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটবে। রাজনৈতিক কারণে মতবিরোধ সব সময় ছিল, এখনো থাকবে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সবার আগে দরকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। বিভিন্ন ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্য যে মতবিরোধ, তা যদি কোনো পক্ষকে ইসরাইলের কাছাকাছি করে ফেলে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আরো বিভক্তি দেখা দেবে। আর যদি তা-ই হয়, তাহলে এই  বিভক্তিই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা  আন্দোলনকে বিলম্বিত করবে না তো?

n লেখক :শিক্ষার্থী, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের

ওপর স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল