প্রদর্শনীতে মুর্তজা বশীরের শিল্পভুবন

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ২২:২৬

ইত্তেফাক রিপোর্ট

বর্ণময় রঙিন ‘পাখা’ সিরিজের ছবিগুলো দেখলে যে কারো মন কাড়বে সন্দেহ নেই। তারই একটি ছবির সামনে সাজানো ম্যাগনিফাইং গ্লাসে চোখ রাখলে সেই ছবিই নতুনভাবে উদ্ভাসিত হয় চোখের সামনে। প্রজাপতির রঙিন পাখা তখন বিমূর্ত চিত্র হয়ে উঠে আসে। এই যে একই ছবি ভিন্ন রূপে দেখা দিচ্ছে মুর্তজা বশীর এর নাম দিয়েছিলেন ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’। এই শিল্পধারার প্রবর্তকও তিনি। সদ্য প্রয়াত বরেণ্য শিল্পী মুর্তজা বশীর শিল্পের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। তার শিল্পজীবন ও গবেষণা এবং শিল্পযাত্রাকে তুলে ধরতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে ‘মুর্তজা বশীরের সৃষ্টি ও প্রসারিত মন’ শীর্ষক প্রদর্শনী।

গতকাল সোমবার ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে বেঙ্গল শিল্পালয়ের দ্বিতীয় তলায় কামরুল হাসান প্রদর্শনশালায় শুরু হয়েছে এ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে স্থান পাওয়া সব কাজই বিভিন্ন ব্যক্তিগত শিল্প-সংগ্রাহকের কাছ থেকে নিয়ে প্রদর্শনীতে স্থান দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ জন সংগ্রাহকের কাজ স্থান পেয়েছে।

মুর্তজা বশীর শিল্পের বহু মাধ্যমে কাজ করেছেন। এঁকেছেন দেয়াল, শহিদ শিরোনাম, পাখা, রমণী, কলেমা তৈয়বাসহ অনেকগুলো সার্থক চিত্রমালা। সমাজচেতনায় উদ্বুদ্ধ এই শিল্পী ক্যানভাসে, লেখায়—শিল্পের নানা মাধ্যমে তার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ প্রদর্শনীতে মুর্তজা বশীরের শিল্পযাত্রাকেই তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বিরল প্রায় ১৫০টি চিত্রকর্ম, স্কেচ, আলোকচিত্র, ক্যাটালগ, অডিও ক্লিপ, মুর্তজা বশীরের লেখা স্ক্রিপ্টে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘নদী ও নারী’র ভিডিও, চিঠিপত্র, পোস্টার, পেপার কাটিং প্রভৃতি।

বেঙ্গল আর্টসের শিল্পী প্রিয়াংকা চৌধুরী গ্যালারির ছবিগুলোর বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মুর্তজা বশীরের শিল্পজিজ্ঞাসা, তার সমাজ সচেতন মানস এবং সমাজ ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে সারা জীবন ধরে বারবার বাঁক বদল করা শিল্পযাত্রাকে। মুর্তজা বশীর বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প-আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার নানামাত্রিক সৃজনে যে বৈচিত্র্য তা তাকে স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল করেছে। এখনকার তরুণ প্রজন্ম যাতে আগ্রহী হয় সেজন্য প্রদর্শনীর উপস্থাপনায় বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। যেমন—নিজের আঁকা বিভিন্ন চিত্রমালা সম্পর্কে মুর্তজা বশীর কী ভাবতেন, তার অডিও ক্লিপ রয়েছে প্রদর্শনীতে। এছাড়াও ফিগারেটিভ কাজে পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধন যেমন ঘটিয়েছেন তেমনি পাশ্চাত্যের প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে তিনি স্বকীয় ধারার যে স্বাক্ষর রেখেছেন সেই ক্রমবিকাশও দেখতে পারবেন শিল্পরসিকরা। তার তেল রঙের কাজ যেমন রয়েছে তেমনি স্কেচ, ড্রইংয়ের অপূর্ব সম্ভারও স্থান পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে। এছাড়া তার কবিতাচর্চা ও কথাসাহিত্যের ভূবনে বিচরণ, মুদ্রা সংগ্রহ ও পোড়ামাটির কাজ নিয়ে যে গবেষণা—আমাদের ঐতিহ্যিক সাংস্কৃতিক প্রবাহে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাও উঠে এসেছে প্রদর্শনীতে।

প্রদর্শনী প্রসঙ্গে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, মুর্তজা বশীর একটি প্রতিষ্ঠান। তাকে এই একটি মাত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তুলে ধরা সম্ভব নয়। প্রদর্শনীতে অডিও, ভিডিও নানান উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে মুর্তজা বশীরের শিল্পযাত্রাকে তুলে ধরা হয়েছে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক রেজওয়ানুল কামাল চৌধুরী জানান, করোনাকালীন সতর্কতার কারণে প্রদর্শনীর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়নি। প্রদর্শনী দেখতে এসেও একসঙ্গে ১০ জনের বেশি দর্শক প্রদর্শনীকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না।

প্রদর্শনী চলবে ১৬ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত। রবিবার বাদে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।