আমাদের বিদ্যানিকেতন তারা পড়ে ও পড়ায়

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২০, ১৮:৩৭

>> আল সানি

 

তিন তরুণহূদয় ভুইয়ান, আলি আফসার, মামুন আহমেদ থাকেন    রাজধানীর শনির আখড়ায়। ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকার চেয়ে এই এলাকাটি তুলনামূলক একটু বেশিই জনবহুল। জনবহুলতার আধিক্যের জন্য ছিন্নমূল শিশুর সংখ্যাও বেশি। তিন তরুণ কিছু করতে চাইলেই এইসব শিশুদের জন্য। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার পার হয়ে একটু সামনে এলেই দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। কলেজের সামনের রাস্তার ফুটপাথে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। সেখানে বছর দেড়েক আগে গোটা দশেক পথশিশুকে নিয়ে শুরু করেন ‘আমাদের বিদ্যানিকেতন’। এখানে পড়া শিশুগুলো কেউই স্বচ্ছল পরিবারের না। কেউ-বা জানেও না তার পরিবার কোথায়। কেউ হয়তো চায়ের ফ্লাক্সটা পাশে রেখেই আনমনে ছবি আঁকছে, কেউ উদোম গায়ে বসে থেকে খাতায় বর্ণমালা লিখছে, কেউ-বা কিচিরমিচির শব্দ করে লুডু খেলছে। দেখতে দেখতে বর্তমানে তাদের বিদ্যানিকেতনে প্রায় ৪০ জন শিশু আছে। সপ্তাহের সাতদিন বিকেল ৪টা থেকে ৬টা এসব অনাহারে অর্ধাহারে থেকে ফুটপাতে দিন কাটানো শিশুদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন এই বিদ্যানিকেতনের প্রায় দুই ডজন স্বেচ্ছাসেবক। সপ্তাহের সাত দিনই চলে তাদের পাঠদান। একদিন বাংলা বর্ণমালা

শেখানো হলে অন্যদিন চলে ইংরেজি বর্ণমালা শেখানো। আবার আরেকদিন গণিত কিংবা বিজ্ঞান। এসব কিছুর সঙ্গে ছবি আঁকা কিংবা খেলাধুলাও বাদ যায় না। আর পড়ানো শেষ হলে সবার জন্য থাকে খাবারের ব্যবস্থা। শুক্রবারে থাকে বিশেষ খাবার। এখানে যুক্ত থাকা স্বেচ্ছাসেবকরাই শিশুদের প্রয়োজনীয় বই, খাতা, কলম, পেন্সিল থেকে শুরু করে খাবারের অর্থটাও দেয় নিজেদের পকেট থেকেই। স্বেচ্ছাসেবক প্রত্যেকেই আশপাশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যেদিন যার ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে সেদিন এসে সে পাঠদান করে। শুরুতে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিল তিন তরুণ—হূদয় ভুইয়ান, আলি আফসার ও মামুন আহমেদ। গত দেড় বছরে তাদের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত হয়েছে, আবার অনেকেই চলে গেছে। তবুও তাদের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। বিশেষ কোনো দিন ছাড়া সবকিছু স্বাভাবিক ও পূর্ব-নির্ধারিত নিয়মেই চলছে। স্কুলটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আলি আফসার বলেন, স্কুলটিতে প্রতিনিয়ত কিছু সমস্যা লেগেই থাকে। এখানে পড়া বেশীরভাগ শিশুই ফুটপাতে ঘুমায়। এদের জন্য খারাপ লাগে। ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে নাইট শেল্টার হোম বানানোর। আমাদের যতটা সামর্থ্য আছে তাই দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি। আগে শুধু এখানে আসা শিশুদের বই খাতা পেন্সিল দিতে পারতাম।  এখন খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।  ভবিষ্যতে থাকার জায়গাও দিতে পারব ইনশাল্লাহ। আমাদের বিদ্যানিকেতনের কাজ শুধুমাত্র পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটপাথে মানবেতর জীবনযাপন করা এসব শিশুদের ভিতর মানবিক গুণগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও করে থাকি।  জানা যায়, মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুদের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সুন্দর একটি জীবন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা কাজ করে যাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড়ো বাধা নিয়মিত ডোনার পাওয়া। মাঝেমধ্যে কিছু সামাজিক সংগঠন তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। এত অপ্রতুলতার মধ্য দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই তরুণরা নিজেদের জমানো অর্থ পথশিশুদের ভবিষ্যত্ নির্মাণে ব্যয় করে যাচ্ছে—এর চেয়ে সুখকর আর কি-বা হতে পারে?