বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগীতা বেশ। এ সময়ের তরুণরা লেখাপড়া শেষে একটি নির্ভরযোগ্য চাকরির সন্ধান করেন। কেউ কেউ চাকরি নামের সোনার হরিনটি পেয়ে থাকলেও বেশিরভাগই তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন। তরুণরা যেমন নির্ভরযোগ্য চাকরি খুঁজছেন তেমনি খুঁজছেন কাজের পরিবেশও। এমনই একটি নির্ভরযোগ্য খাত হচ্ছে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাত। এ খাতের বর্তমান অবস্থা, কাজের পরিবেশ, বেতনসীমা, চাকরির নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আলোচনা হয় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য)-এর সাধারণ সম্পাদক ও ফিফো টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচাক তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কারটি নিয়ে লিখেছেন মাহবুব শরীফ
বিপিও খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি এ খাতের বর্তমান অবস্থানের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ২০০৯ সালে মাত্র তিনশ’ লোকবল নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে বিপিও খাত। বর্তমানে এ খাতে কর্মরত রয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি লোকবল। ধীরে ধীরে মানুষ বিপিও সম্পর্কে জানছে, আগ্রহী হচ্ছে। একটা সময়ে মানুুষের মনে ধারনা ছিল, বিপিও মানে শুধুমাত্র কল সেন্টার। আসলে এ খাতে যে কাজগুলো করা হয় তার ১০ শতাংশ হলো কলসেন্টারের কাজ, বাকি ৯০ শতাংশ অন্যান্য। যেমন ধরুন- জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ও ৩৩৩-এর পিছনে কাজ করছে বিপিও খাতের লোকজন। এ রকম অনেক জায়গায় বিপিও খাতের লোকজন কাজ করছে যা বাইরে থেকে আয়ত্ব করা যাচ্ছে না বলেও জানান তৌহিদ হোসেন।
তিনি জানান, করোনা মহামারীর কারণে বিপিও খাতে অনেক প্রভাব পড়েছে। ১১ বছরের এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২০ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিপিওর কাজ অনেক কম ছিল। ইদানিং আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত বছর এ খাতে ১২ হাজার লোকবল নতুনভাবে যুক্ত হয়েছিল। করেনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান জনবল বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের আগের অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হবে, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো হবে। তিনি জানান, গত বছর এ খাতে আয় হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন ডলার। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২১ সালের এ খাতে লোকবল হবে ৬০ হাজার। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে এ খাতে ১ লাখ লোকবল কাজ করবে এবং আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হবে ১ বিলিয়ন ডলার।
বিপিও খাতে কাজ করতে হলে আগ্রহীদের যোগ্যতা কেমন থাকতে হবে এবং তাদের বেতনসীমা কেমন হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন কলসেন্টারে যাদেরকে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। যেকোনো বিষয়ে লেখাপড়া করলেই হবে তবে এইচএসসি পাস হলে ভালো হয়। প্রার্থীকে কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। স্থানীয় হলে বাংলা ও আন্তর্জাতিক হলে ইংরেজিতে শুদ্ধ উচ্চারণ আবশ্যক। প্রাথমিক অবস্থাতে বাড়তি কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। যোগদানের পরে তাদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে কাজের যোগ্য করা হয়। এ কাজের প্রধান দক্ষতা হচ্ছে গ্রাহকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। কলসেন্টারে কাজ করার জন্য কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, ইতিবাচক মানসিকতা, সহযোগিতা করার মানসিকতা এবং একইসঙ্গে বিভিন্ন কাজ করার সামর্থ্য থাকতে হবে। এখানে কাজের যোগ্যতা হলো যোগাযোগের ভালো দক্ষতা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই পেশায় যারা আগ্রহী তাদের ধৈর্যশীল হতে হবে, গ্রাহকের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করতে হবে। একজন কলসেন্টারের কর্মী চাকরিতে যোগদান করলে সে শুরুতেই আয় করতে পারে ১০-১৫ হাজার টাকা। তবে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ৩০ হাজার টাকার মতো আয় করতে পারে। বিপিও খাতে চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে যোগাযোগে দক্ষতা, কম্পিউটারে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
করোনাকালীন সময়ে বিপিও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছে? তৌহিদ হোসেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমাদের দেশের বিপিও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা দিয়ে থাকে। করোনার কারণে আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ কমিয়ে দিয়েছে। সেফটি ও সিকিউিরিটির কারণেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী কমাতে থাকে। সব মিরিয়ে গত আট মাসে আমাদের কাজ অনেক কমে গিয়েছে। যেহেতু আমাদের আয় কমে গিয়েছে তাই, কর্মীদের বেতন নিয়েও একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে কর্মীদের বেতন পরিশোধ, অফিসের ভাড়া পরিশোধ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়ে ছিলাম। যদিও আমরা এ বাবদ কোনো প্রণোদনা পাইনি। আমরা এখন নিজেদের থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আগামি বছরে শুরু থেকে ঠিকভাবে কাজ করতে পারলে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।
যারা বিপিও খাতে কর্মজীবনের শুরু নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন তাদের উদ্দেশ্যে তৌহিদ হোসেন বলেন, যেকোনো খাতে কাজ করতে গেলে কিছু না কিছু ঝুঁকি থাকে। সে তুলনায় বিপিও খাতে ঝুঁকির পরিমাণ কম। নতুন একজন এ খাতে কাজ শুরু করলে তারা আর নতুন থাকে না, ট্রেনিং ও কাজের অভিজ্ঞতায় তৈরি হয় দক্ষ কর্মী। এ কাজের চাহিদা বিশ্বব্যপী। প্রতিনিয়ত এমন কাজ বাড়তেই থাকবে। মূল কথা হলো- দক্ষ লোকের কাজের অভাব নেই।
