আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৬

মো. রাশেদ আহমেদ

অতিসাম্প্রতিক সময়ে ককেশাস অঞ্চলে আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার মধ্যে ৪ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনে বিতর্কিত নাগারনো-কারাবাখ এলাকা নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দেশ দুটি। উল্লেখ্য, চার দশকের অধিক সময় ধরে বিবদমান এলাকা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে উভয় দেশের মধ্যে। ফলে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ককেশীয় অঞ্চলের দেশ দুটি। যা ২০১৬ সালের পর সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর আর একবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী হয় বিশ্ববাসী। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান উভয় দেশ তত্কালীন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালে বৃহত্তর দেশটির পতন ঘটলে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত আর্মেনিয়া ও মুসলিম গরিষ্ঠ আজারবাইজান পৃথক দেশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। বলে রাখা ভালো, নাগারনো-কারাবাখ এলাকাটি আজারবাইজানের অংশ ছিল। যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ১৯৯২ সালে আর্মেনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জোরপূর্বকভাবে এলাকাটি দখল করে নিলে যুদ্ধের সূচনা ঘটে। শুধু তাই নয়, এলাকাটি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা স্বায়ত্তশাসনের ঘোষণা দিলে এতে স্বীকৃতি দেয়নি কোনো দেশ। বরং সময়ের পরিক্রমায় যুদ্ধকে উসকে দিয়েছে আর্মেনিয়া। যা এখন দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। কার্যত, বহুবিধ কারণে নাগারনো-কারাবাখ এলাকাটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ খনিজসম্পদ, সিসা, মার্বেল, চুনাপাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ। এছাড়া ভৌগোলিক কৌশলগত দিক থেকে উক্ত এলাকা উভয় দেশের জন্য তাত্পর্য বহন করে। নাগারনো-কারাবাখ বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ মেটাতে ১৯৯২ সালে গঠিত হয় ওএসসিই মিনস্ক গ্রুপ। এর বর্তমান সদস্য ফ্রান্স, ইউরোপের নিরাপত্তা পরিষদ, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৪ সালে মিনস্ক গ্রুপের সহায়তায় উভয় দেশ শান্তির প্রস্তাব মেনে নিলেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ এই মিনস্ক গ্রুপ। ইতিমধ্যে, আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধে বিভিন্ন দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তুরস্ক সরাসরি আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়ে যে কোনো ধরনের সহায়তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং ভবিষ্যতে তা অব্যাহত থাকবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান, আফগানিস্তান বাকুকে সমর্থন প্রদান করে। অন্যদিকে, আর্মেনিয়ার পক্ষে কথা বলতে দেখা যায় ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি দেশকে। তবে এবার যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে রাশিয়া। প্রেসিডেন্ট পুতিন নাগারনো-কারাবাখ আর্মেনিয়ার স্বীকৃতি এলাকা না হওয়ায় কোনো ধরনের সহায়তা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, উভয় দেশকে সাময়িক যুদ্ধ বন্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় মস্কো প্রশাসনকে। আর্মেনিয়া আজারবাইজান উভয় দেশের সঙ্গে রাশিয়ার উষ্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। যেখানে দুটি দেশের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করে থাকে রাশিয়া।

দেশের সেনাবাহিনীর সংখ্যার দিক থেকেও এগিয়ে আজারবাইজান। সরকারি তথ্যমতে, আর্মেনিয়ার ৩০ শতাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বলতে সংকোচ নেই, ইরেভান থেকে শক্তিমত্তার দিক থেকে এগিয়ে বাকু। গত ২৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩০০ বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৭০ হাজার জনগোষ্ঠী। বেশি ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়েছে আর্মেনিয়া। বর্তমান আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ মস্কোর মধ্যস্থতায় সাময়িক বিরতি যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। যদিও ইতিমধ্যে দুই পক্ষ যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘনের জন্য পরস্পরকে অভিযুক্ত করেছে। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিতর্কিত ভূখণ্ড নাগারনো-কারাবাখ এলাকা আজারবাইজানের কাছে হস্তান্তরের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। অনুমান করা যায়, এ যুদ্ধের ফলে আগামী দিনে উভয় দেশ প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করবে। হয়তোবা নতুন কোনো পরাশক্তি দেশের সঙ্গে সাময়িক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে। এতে উভয় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়তে পারে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কিংবা উত্তেজনা। বলা যায়, ভবিষ্যতে আজারবাইজান তার হারানো ভূখণ্ড ফিরে পেতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে পারে সে কথা বলা বাহুল্য। এ যুদ্ধে আর্মেনিয়া তার অবৈধ দখল এলাকা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে বিশ্ববাসীর কাছ থেকে। যুদ্ধ কখনোই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। বরং এ পথ রুদ্ধ করে। সৃষ্টি করে জঙ্গিবাদের মতো নতুন সংকট। যার উদাহরণ সিরিয়া, লিবিয়া অথবা ইরাকের মতো যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ। সুতরাং বর্তমান আর্মেনিয়া-আজারবাইজান যুদ্ধ সাময়িক বিরতিকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে উভয় দেশকে সংযত আচরণ করে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে রাশিয়া। তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ককেশাস অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া