দিদারুল আলম
হাইকোর্ট বলেছে, শুধু ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার অজুহাতে ধর্ষণ মামলা থেকে ধর্ষক খালাস পেতে পারে না। ভিকটিমের জবানবন্দি ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতেই তাকে সাজা প্রদান করা যেতে পারে। ‘ইব্রাহিম গাজী বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিকটিম বা তার পরিবার থানা কিংবা আদালতে মামলা করবে কি করবে না সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। কেননা এর সঙ্গে ভিকটিম ও তার পরিবারের মানসম্মান জড়িত। অনেক চিন্তাভাবনার পরই সাধারণত তারা থানা কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হন।
২০০৬ সালের ১৫ এপ্রিল ভোরে খুলনার দাকোপে মো. ইব্রাহিম গাজী ধর্ষণ করে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে। এ নিয়ে সালিশের উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হন স্থানীয় ইউপি সদস্য। আসামিপক্ষ বিভিন্নভাবে ভিকটিমের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখান। দুই দিন পর থানায় মামলা করতে গেলে দাকোপ থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে ২৫ এপ্রিল খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা করেন ভিকটিমের বাবা। ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণ করে অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা করতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকেও বলা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিবেদনে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আসামি ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। পাঠানো হয় কারাগারে। গত বছরের ১৩ মার্চ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ঐ সাজা বহাল রাখে। সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ এ রায় প্রকাশ পেয়েছে। রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ঘটনার ৩২ দিন পর ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য বলা হয়। ঐ সময় যদি ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হতো তাহলে ধর্ষণের আলামত না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না করার কারণে প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষ) মামলা অপ্রমাণিত বলে গণ্য হবে না। ‘আব্দুস সোবহান বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় ঘটনার ২১ দিন পর ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া না গেলেও ভিকটিমের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়ায় আসামিকে দেওয়া সাজা আপিল আদালত বহাল রেখেছে। কাজেই শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা অভিযুক্ত ধর্ষণ করেনি এই অজুহাতে সে খালাস পেতে পারে না।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় আসামির পিতা ও চাচারা স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাধর। এরা প্রথম থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট ছিলেন। আসামির পিতা সালিশে বলেন, ‘এ যুগের ছেলেমেয়েরা এমন করে’; যা অত্যন্ত আপত্তিকর কথা। এতেই বোঝা যায় যে আসামিপক্ষ থানা পুলিশকে প্রভাবিত করে, যার কারণে থানা মামলা গ্রহণ করেনি। ভিকটিম শিশু এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তার সাক্ষ্য প্রদানকালে ধর্ষণের মতো লজ্জার কথা নিজমুখে বর্ণনা করেছেন। তার সামনে অনাগত স্বপ্নীল ভবিষ্যত্ থাকা সত্ত্বেও নিজমুখে আসামির বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকতে পারে না এবং আমরাও তা খুঁজে পাই না। এই মামলায় ভিকটিমের দেওয়া জবানবন্দি সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য। এই রকম ধর্ষণের অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু ভিকটিমের সাক্ষ্যকে বিশ্বাস করেই আসামিকে সাজা প্রদান করা সঠিক ও সমীচীন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌসী (রুপা) ও জাহিদ আহমেদ হিরো ইত্তেফাককে বলেন, এ রায় যুগান্তকারী। শুধু মেডিক্যাল রিপোর্ট না থাকার কারণে অনেক মামলায় ধর্ষক খালাস পেয়ে যান। এই রায় সেক্ষেত্রে নতুন করে আমাদের ভাবনার খোরাক জোগাবে।
