১কার্তিক, ১৪২৭, বাংলার মহান চিন্তানায়ক মহাত্মা লালন ফকিরের ১৩০তম তিরোধান দিবস। গত বছর পর্যন্ত দিবসটি সরকারি উদ্যোগে পালিত হলেও এ বছর করোনা মহামারির কারণ দেখিয়ে সরকারি আনুষ্ঠানিকতা না করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নামমাত্র স্বাস্থ্যবিধি পালনের হুকুম দিয়ে গাড়িঘোড়া চলাচল, বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশ, বাজার-ঘাট, শপিংমল খুলে দেওয়া গেলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাবেশের মতো এ বছর লালন স্মরণ অনুষ্ঠান পালন করা যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসন। তা প্রশাসন শৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি রক্ষায় ঝুঁকি অনুভব করলে তাদের নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃত্বাধীন আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন বৈকি; তবে লালন অথবা তাঁর মতো সাধক-মরমিদেরকে হূদয়ে রেখে বাংলার গণমানুষের যে অনুষ্ঠান-আয়োজন তা প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের ‘এন্তেজারী’ নয়। কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নয় বরং বেসুমার প্রতিকূলতা ঠেলে বিগত প্রায় দুইশত বছর ধরে, অন্তর্নিহিত বস্তুশক্তিতে লালন ও তাঁর বাণী টিকে আছে বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষের হূদয়ে। হালে উদ্যাপনের নামে মানুষের চোখে ধুলো দিতে বারোয়ারি যে মেলা-মচ্ছবের আয়োজন সেখানে হয়, একটি বছরও তা থেকে মুক্ত থাকা গেলে খুব ক্ষতির কারণ দেখি না। হালে লালন একাডেমির নামে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে ১ কার্তিক আর দোল পূর্ণিমা তিথিতে যে বাজার-সংস্কৃতির মহাযজ্ঞ সেখানে আয়োজিত হয়ে আসছে, যেকোনো উছিলায় তা কখনো স্থগিত থাকলে ফকির-বাউল বা লালন অনুরাগীদের বড়ো ক্ষতির কারণ দেখি না।
এ যুগের দার্শনিক মিশেল ফুকো (দ্য আর্কিওলজি অব নলেজ, ১৯৬৯) বলেছেন, ‘ভাষা যার দখলে, সত্য তার দখলে’। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে যে রাজনৈতিক হুজ্জতি লক্ষ করা যায় তাতে ফুকো-বচনই নতুন করে মনে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের মহল বিশেষ হঠাত্ই লক্ষ করেছেন যে পশ্চিম বাংলা আর বাংলাদেশের বাংলার মধ্যে বেশ পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে! এ প্রশ্নে গত ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে বিবিসি বাংলা নিউজ পরিবেশিত এক খবরে জানা যায়, দু’ বছর আগের এই দিনে উত্তর দিনাজপুর জেলার একটি স্কুলে উর্দু শিক্ষক নিয়োগের প্রতিবাদ বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে দুই বিজেপি কর্মী নিহত হবার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি ঐ দিনটিকে ‘ভাষা দিবস’ হিসাবে পালনযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে। এপার আর ওপার বাংলার বাংলা ভাষার পার্থক্য বোঝাতে তারা এমন কিছু শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন যা অভিনব। তারা বলছেন, সনাতনী বাংলা, বাবু বাংলা, মুসলমানি বাংলা, মিয়া বাংলা বা ঢাকাইয়া বাংলা। গহিনে দেখলে শব্দ ব্যবহারে প্রচ্ছন্ন উস্কানির ঈঙ্গিত গোপন থাকে না। তবে বিচক্ষণ ভাষা তাত্ত্বিকেরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন মোটেও। তারা মনে করেন, ভাষা একটি জীবন্ত বিষয়। নানা সূত্র থেকে স্বতঃস্ফূর্ত দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে তা বেঁচে থাকে। বিশেষ সভা-সমাবেশে বক্তৃতা, সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাষার গতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। ক্ষমতা, কর্তৃত্বের লড়াইয়ে ভাষার গুরুত্ব অসীম। ক্ষমতাধরদের কুচুটেপনায় কোনো ভাষা বা সেই ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর উপকার করা না গেলেও ক্ষতি যে করা যায় তা আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা কমবেশি জানি বৈকি;
এ প্রসঙ্গে বাঙালির হিমালয়সম উত্তরাধিকার, লালন ফকিরের কথা মনে পড়ে। তিনি যে বাংলার সমন্বয়বাদী ভাবের ধারার অনন্য প্রবক্তা সে কথা বাংলাভাষী মাত্রেই জানেন। তাঁর গানের বাণীতে বা তত্ত্বে কোনো হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নেই। কেবল মানুষকে লক্ষ্যে রেখে উচ্চারিত তাঁর পঙিক্তমালা এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য তা অমিত আশীর্বাদস্বরূপ। অথচ ট্র্যাজেডি এই যে, প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত, পাশ দেওয়া অনেক বাঙালি ইদানীংকালে লালনের গানে নানারকম ভাবের অভিব্যক্তিতে শরীর দোলালেও গানের শব্দ আর ভাষা বুঝতে পারেন না। আমি বাণীর অন্তর্নিহিত তত্ত্বের কথা বলছি না, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা বহু লালনভক্তের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা লালনের গানের বহু বাংলা শব্দেরই অর্থ ধরতে পারেন না। পাশাপাশি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা যায়, নিরক্ষর বা সামান্য অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন কৃষক, শ্রমজীবী, প্রান্তিক মানুষ বলে চিহ্নিতরা অবলীলায় এ শব্দ-ভাষা নিজের মতো করে হূদয়ঙ্গম করেন। এই না বুঝতে পারা শিক্ষিতের দলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই কারণ নিজেদের অজ্ঞাতে তারা শিক্ষা নামক কেরানি তৈরির দিগন্ত বিস্তৃত জালে বন্দি। সেই ইংরেজ ম্যাকলের জাল। শাসনকাজের সুবিধার্থে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ্বে ম্যাকলে প্রবর্তিত ইংরেজ-বান্ধব শিক্ষানীতি আমাদের শিখিয়েছে বহুকিছু, কিন্তু ক্রমাগত শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজটি করে চলেছে সন্তর্পণে। তা না হলে যে ভাষার অধিকারের দাবিতে সৃষ্ট আন্দোলন একটা স্বাধীন দেশের জন্ম দেয়, সে দেশের প্রধান দাপ্তরিক ভাষা আজও ইংরেজি, আদালতের রায় লেখা হয় ইংরেজিতে! দেশের উচ্চকোটির গর্বের ভাষা ইংরেজি! এসবই পরিহাস!
বিভিন্ন কারণে উনিশ শতকটি ভারত উপমহাদেশ তথা বাংলার জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। আঠারো শতকের শেষে জন্ম নিয়ে উনিশ শতক জুড়ে বেঁচে ছিলেন বাংলার যুগপুরুষ লালন ফকির। যে নদীয়া অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা, বাংলা ভাষার উত্কৃষ্ট রূপ বলে গণ্য, সে ভাষাতেই বাণী কীর্তন করে গেছেন লালন। এ শতকেরই গোড়ায় ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত, ব্রাহ্মণদের সহায়তায় বাংলা ভাষা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা সুশৃঙ্খল বাংলা গদ্যরীতি নির্মাণে প্রভূত অবদান রাখলেও বাঙালির যাপিত জীবনের মুখের ভাষার সাথে রচনা করে ব্যবধান। ইংরেজের উনিশ শতকী শিক্ষানীতি জোড়াতালি দিয়ে শাসন ও খাজনা আদায়ের কাজটি চালিয়ে নিলেও মাটির সংস্কৃতি ও দর্শন থেকে উল্লেখযোগ্য একটি জনসমষ্টিকে বিচ্যুত্ করে ফেলেছে। সে কারণে আমরা লালন, হাসন, বিজয়, রাধারমণ বুঝি না। এঁদের সুর আর বাণীতে আলোড়িত হলেও বাণীর অন্তর্নিহিত বার্তা আমাদের সে তুলনায় স্পর্শ করে সামান্য। আমার বিশ্বাস, এ সমস্যা রনীন্দ্রনাথ পাঠের ক্ষেত্রেও হয়। কেবল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আত্মস্থ করা যায় না। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আমরা যত শিক্ষিত হচ্ছি ততই যেন নিজের ভাষা-সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। যে বাংলা ভাষা মায়ের মুখে শুনে আমাদের বাংলা মানস গঠিত, স্কুলে-প্রতিষ্ঠানে পরিশীলন-প্রমিতকরণের নামে তা অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রভু শ্রেণির রাজনীতি থাকে। মোগল, ব্রিটিশ শাসনাবসানে দেশ দুই দুইবার স্বাধীন হলেও অদূরদর্শী-অপরাজনীতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রটি দেশের দিকে মুখ ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে শোচনীয়ভাবে। সে কারণে আমরা এখনো ‘আকাশ-কুসুম চয়নে’ সার্থকতা খুঁজি, মরে গিয়ে বেহশত পাবার আশায় জীবনপাত করি। লালনের ভাষায়, যেন ‘মণিহারা ফণীর মতো, হারাহলাম পিতৃধনে’।
