আপনি সারা দিনে কত কিছু ভাবেন, তাই না? সেই ভাবনার সংখ্যাটা কত হতে পারে জানেন? জানলে কিন্তু আপনার চোখ কপালে উঠবে। সুকুমার রায় যেমন তার বিষম চিন্তা ছড়ায় বলেছেন—
মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার—
সবাই বলে, ‘মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার!’
নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে এক ব্যক্তি গড়ে ৬ হাজারের বেশি চিন্তা করে। এসব চিন্তার কিছু থাকে পরিকল্পিত, কিছু থাকে আকস্মিক আসা সিদ্ধান্ত, আবার কিছু থাকে একেবারে আকাশকুসুম কল্পনা। এসব চিন্তার মধ্যে ভালোমন্দ দুই রকমই থাকে। কিছু চিন্তা মানুষ সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে যায়। আবার কিছুসংখ্যক ভবিষ্যত্ ‘পরিকল্পনা’ হিসেবে টিকে থাকে।
এই গবেষণায় গবেষকরা দিনের মুহূর্তগুলোকে পৃথক করেছেন। কোনো ব্যক্তি যখন একক চিন্তায় মনোনিবেশ করে, সেই অবস্থাকে ‘চিন্তার কীট’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একটি কীট যেমন নির্দিষ্ট সময়ে তার কিছু কাজ করে। মানুষের মস্তিষ্কের ‘চিন্তার কীট’ও ঠিক সেভাবে মনোযোগ সহকারে অথবা অবচেতন মনে চিন্তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিন্তার ধারা এবং গভীরতা প্রত্যেক মানুষের জন্য একরকম নয়। এটি তাদের ব্যক্তিত্বের এবং সামাজিক অবস্থার ওপর খানিকটা নির্ভর করে। সেই অনুযায়ী চিন্তারও পরিবর্তন হয়। কানাডার কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স রিসার্চ গবেষক জর্ডান পপপেনক বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি একটি নতুন চিন্তার দিকে অগ্রসর হয়, তখন তারা একটি নতুন ‘চিন্তার কীট’ তৈরি করে। আসলে মানুষের মস্তিষ্ক হলো তার নিজস্ব চেতনা, উপলব্ধি, বিচারবুদ্ধি ও স্মৃতি—এসবের সমন্বয়ে একটি অসীম, বহুমুখী এবং অপূর্ব জ্ঞানীয় অনুষদ।
আপনি কি জানেন, যতই চেষ্টা করুন, মন থেকে অন্তত তিন ধরনের চিন্তা কিছুতেই তাড়াতে পারবেন না। মনোবিজ্ঞানী সুজান উইনশেঙ্ক তার বই ‘নিউরো ওয়েব ডিজাইন : হোয়াট মেকস দেম ক্লিক’ বইতে বিষয়টি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করছেন। তিনি মানবমস্তিষ্ককে তিন ভাগে ভাগ করছেন—আদি মস্তিষ্ক, মধ্য মস্তিষ্ক এবং আধুনিক মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কের এই তিনটি অংশের কাজ আলাদা আলাদা রকমের। আধুনিক মস্তিষ্ক হলো সেই অংশটি যা সচেতন, যুক্তিযুক্ত এবং যে অংশটির অস্তিত্ব আপনি সর্বক্ষণ টের পান। মধ্য মস্তিষ্কের কাজ হলো আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর আদি মস্তিষ্ক হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ যা আপনার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সদা সক্রিয়। বিবর্তনের ধারায় এই আদি মস্তিষ্কেরই উন্নতি ঘটেছিল সবার আগে।
এই আদি মস্তিষ্ক সর্বক্ষণ আমাদের পরিবেশ এবং অবস্থাকে জরিপ করে চলেছে এবং আশপাশের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে ভেবে চলেছে তিনটি ভাবনা—১) ‘আমি কি এটিকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারি?’ ২) ‘আমি কি এর সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হতে পারি?’ এবং ৩) ‘এটি থেকে কি আমার প্রাণসংশয় হতে পারে?’
অর্থাত্ এই আদি মস্তিষ্ক কেবল তিনটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন—খাদ্য, যৌনতা এবং বিপদ। আদপে টিকে থাকার জন্য এই তিনটি বিষয়ই হলো মৌলিক প্রয়োজন। খাদ্য ছাড়া প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, নিজের বংশগতিকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য প্রয়োজন যৌনতা এবং বিপদ সম্পর্কে সচেতন না হলে অকালে প্রাণ হারাতে হতে পারে।
কাজেই পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব মুহূর্ত থেকেই এই তিনটি ভাবনা ভাবিত করে আসছে মানুষকে। বিজ্ঞানীদের দাবি, আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, খাদ্য, যৌনতা এবং বিপদের চিন্তাকে আমরা মন থেকে তাড়াতে পারব না। তার অর্থ এই নয় যে, আমরা সর্বক্ষণ কেবল খেতে চাইছি, যৌনতায় মাততে চাইছি, কিংবা কোনো বিপদের আশঙ্কায় ভুগছি; কিন্তু অবচেতনে এই তিনটি চিন্তা আমাদের মনের মধ্য কাজ করে চলেছে। আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখনো কিন্তু এই তিনটি আদি ভাবনা আপনার আদি মস্তিষ্ক অবচেতনে ভেবেই চলছে।
প্রকৃত অর্থে, এই বৈশিষ্ট্য কেবল মানুষের নয়, প্রতিটি প্রাণীর আদি মস্তিষ্কে কাজ করছে। মানুষ যেহেতু এই তিনটি ভাবনার বাইরেও তার মস্তিষ্ককে আরো চিন্তাশীল ভাবনায় নিয়োজিত করতে পারে, সেজন্য আর ১০টি প্রাণী থেকে আমরা সামান্য আলাদা মাত্র; কিন্তু প্রাণিজগতে (মানুষসহ) সবাই আসলে এই তিনটি মৌলিক ভাবনা দ্বারাই টিকে রয়েছে। অর্থাত্ আমার অস্তিত্বের জন্য এই তিনটি ভাবনার গুরুত্ব সীমাহীন।
n লেখক :কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার
