দৃষ্টিহীনতাকে তুচ্ছ করে এরিক ওয়েহেনমায়ারের শৃঙ্গ জয়ের গল্প

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৯

>> মামুনুর রশিদ রাজিব

 

দৃষ্টিহীন হয়েও এভারেস্ট জয় করার মতো অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছেন এরিক ওয়েহেনমায়ার। গল্পের শুরুটা ১৯৬৮ সালে তার জন্ম থেকেই। ১৫ মাস বয়সে তার জুভেনাইল রেটিনোসকাইসিস নামক বিরল রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানা যায়। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ফিকে হতে হতে ১৪ বছর বয়সে এসে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায় সে। সাধারণ গল্পে কী হতো? বালকটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়বে, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই বালকের ক্ষেত্রে গল্পটি উল্টো। সে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে তার আগ্রহ জন্মে রেসলিংয়ের প্রতি। সেখান থেকে হাই স্কুলের সেরা রেসলার প্লেয়ার হয়ে ওঠা, দলের ক্যাপ্টেন হওয়া এবং এভাবেই খেলাধুলায় সাফল্য আসতে থাকে। এর পাশাপাশি আরেকটি আগ্রহ তার ভিতরে জন্ম নেয়—রক ক্লাইম্বিং বা পর্বতারোহণ। অনুশীলন চলতে থাকে সেটিরও। গল্পের এই নায়কের নাম এরিক ওয়েহেনমায়ার। গল্পে না হয় সংক্ষেপে তাকে এরিক বলেই সম্বোধন করা যাক। ১৯৯৫ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০,৩১০ ফুট উঁচু উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ডিনালি পর্বত। পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের মধ্যে ডিনালির অবস্থান তৃতীয়। আলাক্সা পর্বতশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এ পর্বতে নিঃসন্দেহে এক নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলেন এরিক। যখন তিনি এর সর্বোচ্চ চূড়ায় পদচিহ্ন অঙ্কন করতে সক্ষম হন।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে সর্বকালের সেরা আকর্ষণের নাম এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ। এ আকর্ষণ এড়িয়ে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি লুফে নেওয়াও। দৃষ্টিহীনতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে মানসিক শক্তি এবং কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে এভারেস্ট জয়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন এরিক। ২০০১ সাল। এরিক ওয়েহেনমায়ার তার দলের সঙ্গে এভারেস্টের পথে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে কাঠমান্ডু যাত্রা। কাঠমান্ডুতে মানুষকে বিশ্বাস করাতে তাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল যে তিনি সত্যিই এভারেস্ট জয়ে যাচ্ছেন। সবকিছু পেরিয়ে এরিক যখন চূড়ার প্রায় কাছাকাছি সেই সময়টা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভয়ংকর সময়! একে তো নিজের ভিতরে দুরু দুরু ভাব, তার ওপর সহযাত্রীদের দিকনির্দেশনা। একজন বলছে এই দিক দিয়ে দুই পা গেলেই শৃঙ্গ, আরেকজন বলছে আর দশ পা। তবে এরিক সম্পূর্ণ মনোযোগকে একবিন্দুতে এনে নিজের পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এভারেস্টে সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখেন। দিনটা মে মাসের ২৫ তারিখ। এর মাধ্যমে ইতিহাস গড়েন এরিক ওয়েহেনমায়ার। প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে এভারেস্ট জয়ী। এই জয় নিজের ইচ্ছাশক্তির জয়, এ জয় সমালোচকদের অবিশ্বাসকে বিশ্বাসে পরিণত করতে পারার জয়, এ জয় প্রতিবন্ধীত্বকে অতিক্রম করার জয়।