মিউচুয়াল ফান্ড কোন পথে

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৮

বিএসইসির চেয়ারম্যান সম্প্রতি বলেছেন, সাধারণ মানুষ যদি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ১০ শতাংশ প্রফিট পায়, তবে তাদের ব্যাংকে এফডিআর রাখার দরকার পড়বে না। কথাটা যথার্থ। কারণ, ব্যাংকের আমানতে এখন নামমাত্র সুদ দেয়। তারপরে বিভিন্ন কাটাকাটির পরে হাতে যা পাওয়া যায়, তার পরিমাণ অতি নগণ্য। রিয়াল ইনকাম থাকে না বললেই চলে। এখন প্রশ্ন হলো—মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ কতখানি ঝুঁকিমুক্ত, একজন বিনিয়োগকারীকে সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনিট ফান্ড, পেনশন ফান্ড-এগুলো। এরাই      প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। ব্যাংক বা মার্চেন্ট ব্যাংক নয়। যে দেশের শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের অবদান বেশি, সেই সব শেয়ারবাজারের নিজস্ব  শক্তি বেশি। এ কারণে পৃথিবীর প্রায় সব স্টক এক্সচেঞ্জ মিউচুয়াল ফান্ড আনতে অতি আগ্রহী।

আমাদের দেশের মিউচুয়াল ফান্ড সেক্টরের অবস্থা কি? ১৯৭৮ সালে আইসিবি প্রথম মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে নিয়ে আসে। এরপর একে একে আরো মোট আটটি ফান্ড শেয়ার মার্কেটে আসে। এরপর বেসরকারি খাতের এইমস-১ আর গ্রামীন-১ ফান্ড দুইটি আসলে মানুষ আগ্রহী হয়ে তাতে বিনিয়োগ করে। আইসিবি আর এই দুইটি ফান্ডই ছিল ক্লোজ অ্যান্ড (মেয়াদী) ফান্ড। অর্থাত্ এদের মেয়াদকাল সীমিত। ২০১০ সালে শেয়ার মার্কেট হঠাত্ করে বুম হয়ে যায়, আর যথারীতি পতন ঘটে। এই সময় বাজারকে সাপোর্ট দিতে যেখানে আরো ব্যাপক সংখ্যক ফান্ড নিয়ে আসার দরকার ছিল—সেখানে বিএসইসি উলটো কাজটি করে। এদেরকে ক্লোজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই খবর শেয়ারবাজারে ছড়িয়ে পড়লে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর শেয়ারমূল্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। এই ভাবে আরো দুই তিন বছর কেটে যায়। কিন্তু ২০১৬ সালে যখন বিএসইসি ক্লোজ এন্ড ফান্ডগুলো চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়, তখন এই আদেশের বিরুদ্ধে একজন বিনিয়োগকারী হাইকোর্টে রিট করে। হাইকোর্ট ঐ বিনিয়োগকারীর পক্ষে রায় দিলে  বিএসইসি আপিল করে। আপিল আদালত হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে বিএসইসির পক্ষে সিদ্ধান্ত প্রদান করে। এরপর এইমস-১ আর গ্রামীন-১ ফান্ডগুলো ক্লোজ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীদেরকে এনএভি অনুযায়ী টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। এইটা ছিল মন্দের ভালো। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই, বিএসইসি তাদের নিজেদের দেওয়া সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে ক্লোজ অ্যান্ড ফান্ডগুলোকে এক্সটেনশনের পারমিশন দিতে শুরু করে। এই বছর ফান্ডগুলোর বেশির ভাগ শেয়ারহোল্ডারদেরকে ডিভিডেন্ড প্রদান করেনি। অজুহাত ছিল করোনার। কিন্তু করোনার আমল তো শুরু হয় মার্চ মাসের পর। আগের ৯ মাসের প্রফিট গেল কোথায়?

আবার ফিরে যাই, বিএসইসির চেয়ারম্যানের কথায়। তার কথায় যুক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে সংশয়। সংশয় ডিভিডেন্ড নিয়ে যেমন আছে, তেমনি আছে ক্যাপিটাল লসের সংশয়। এই সংশয় দূর করতে হবে সবার আগে। কিভাবে...?

১) আইসিবির এক থেকে আট পর্যন্ত ফান্ডগুলো পুরোপুরি অবলুপ্ত করা হয়নি। এগুলোকে ওপেন অ্যান্ড (বেমেয়াদী) তথা ইউনিট ফান্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। একটু আন্তরিক আর সচেষ্ট হলে এই ফান্ডগুলোকে পুনরায় মিউচুয়াল ফান্ডে ট্রান্সফার করে রেগুলার শেয়ারবাজারে ফেরত আনা সম্ভব হবে। এতে করে পুনরায় মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হবে। আইসিবির ফান্ডগুলো আর এইমস-১, গ্রামীন-১ ফান্ড বন্ধ করার পর এখন মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনে মিউচুয়াল ফান্ডের অবদান ১ শতাংশের নিচে এসে গেছে। এর বিপরীতে ভারতে এর অবদান ৪০ শতাংশের ওপরে। আমাদেরকেও সেই পথ ধরে এগুতে হবে। তবে তার জন্য সবার আগে এই খাতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা করতে হবে।

২) বিশেষ কোনো কোম্পানি বা ফান্ড ম্যানেজারের স্বার্থরক্ষা বা প্রয়োজন মেটাতে নিজেদের তৈরি আইন জলাঞ্জলি দেওয়া চলবে না। বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর পুঁজির প্রকৃত অবস্থা কি, তাও বিনিয়োগকারীদের বলতে হবে। এই ফান্ড কোন খাতে বিনিয়োজিত আছে, তা প্রকাশ করতে হবে। বেশির ভাগ ফান্ডের এনএভি কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। সেই সঙ্গে কঠিন জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে- ফান্ডগুলোকে।

৩) মিউচুয়াল ফান্ডের বার্ষিক আয়ের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ ডিভিডেন্ড আকারে পরিশোধ করতে হবে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে অজ্ঞ, পেনশনিয়ার, বিধবা, অর্ধশিক্ষিত সাধারণ মানুষেরাই এই খাতে বিনিয়োগ করে। তাদের পক্ষে ফান্ড ম্যানেজাররা দায়িত্ব পালন করে থাকে। স্বভাবতই ন্যায্য ডিভিডেন্ড-এর হকদার তারা।

পরিশেষে একটা কথাই বলার আছে। বিএসইসির কথায় কিন্তু মানুষ ব্যাংকের এফডিআর ভেঙে এখানে অর্থ বিনিয়োগ করবে। তাই শেয়ারবাজারের লোভী মানুষগুলো যাতে এদেরকে পথে বসাতে না পারে—তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।