আমি একদিনও না দেখিলাম তারে...

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ২২:৩৫

যত দিন যাচ্ছে ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও গানের ব্যাপ্তি ততই প্রভাব বিস্তার করছে মানুষের মাঝে। ১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন, মৃত্যু হয়েছে ১৩০ বছর আগে। কিন্তু তার পরও তার বাণী ও সুরের ঔজ্জ্বল্য বেড়েই চলেছে। আজ ফকির লালন শাহের ১৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর এ সময় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় কালিন্দী নদীর ধারে লালন ভক্ত-সাধকদের মিলনমেলা বসে। হয় তিন দিন ধরে অনুষ্ঠান। এবছর করোনাকালের জন্য সেই অনুষ্ঠানে ভাটা পড়েছে। তার পরেও ভক্ত অনুসারীরা অনেকেই লালন সাঁইকে ভক্তি জানাতে তার মাজারে উপস্থিত হয়েছেন।

এদিকে, শিল্পকলা একাডেমি ফকির লালনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। রয়েছে আলোচনা, সেমিনার ও সাধুমেলা। শুক্রবার থেকে দুই দিনব্যাপী এ লালন স্মরণোত্সব চলবে রাজধানীসহ দেশের ৬৪ জেলায়।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার এক গভীর জঙ্গলে সাধক শিরোমণি ফকির লালন শাহ তার অনুসারী-ভক্তদের নিয়ে যে আখড়া গড়ে তুলেছিলেন, তা এখন সারা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ফকির লালন শাহ তার গানের বাণীর ভেতর দিয়ে একটি সুসঙ্গবদ্ধ জীবন বিধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার গান এক গভীর দ্যোতনায় এই বিশ্ব-সংসার, মানবধর্ম,              ঈশ্বর ও ইহলৌকিক ও পারলৌকিকতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য করে। সব মরমি সাধকেরই পরম্পরা থাকে। তবে লালনের দ্যুতি এমনই তীব্র ও রহস্যময় যে তারপরে আর কোনো মরমি সাধক নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। দুই শতাব্দী ও সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও আজো লালন মরমি জগতের সার্বভৌম ব্যক্তি।

সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির বিশাল মাঠ যেন পরিণত হয়েছ ছেঁউড়িয়ায়। এক প্রান্তে কুঁড়েঘরের আদলে স্থাপিত হয়েছে বাউলকুঞ্জ। সেখানে বাউলরা মেতে উঠেছিলেন গানের সুরে লালন বন্দনায়। লালনভক্ত সাধুরা বলছিলেন, লালনের গানে সবার ওপরে রয়েছে মানুষ। সবকিছুর সন্ধান পাই তার গানে। কোরআন, বেদ, মানবধর্ম, জগতের সব ভাবনার উত্তর। কিন্তু লালনকে বুঝতে পারি না। সারা জীবন ধরে লালনেরই সন্ধান করে চলেছি।

সন্ধ্যায় বাউলকুঞ্জে বসেছিল বাউল গানের আসর। লালন সাঁইয়ের গানের মুখরিত হয়ে ওঠে শিল্পকলা প্রাঙ্গণ। বাউল নূরতাজ দেওয়ান গেয়ে শোনান—বাড়ির পাশে আরশীনগর/সেথা এক পড়শি বসত করে/আমি একদিনও না দেখিলাম তারে ...। পাগলা বাবুল গেয়ে শোনান—এমন মানবসমাজ কবে গো সৃজন হবে/যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতি গোত্র নাহি রবে’। সন্ধ্যা রাণী দত্ত শোনান, ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ শীর্ষক সংগীত। রতন দেওয়ানের গাওয়া গানের শিরোনাম ছিল ‘দয়াল নাম যার হূদে ভরা’। হানিফ বাউল পরিবেশন করেন ‘ফকির ফিকির মাখামাখি’। এলিজা পুতুল শুনিয়েছেন ‘যার ভারে মুড়েছি মাথা’। এছাড়াও গান শোনান ফেরদৌসী লাবণী, মিতু মণ্ডল, জেবি ঝর্ণা প্রমুখ। 

শুক্রবার দিনের প্রভাতী কার্যক্রম শুরু হয় মুজিবববর্ষ উপলক্ষ্যে বাউল দলের ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদঘুরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে। এরপর একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাউল গান ও বাউল দর্শনবিষয়ক কর্মশালা। অনুষ্ঠানে লালনগীতি পরিবেশন করেন ফকির নহির শাহ্, ফরিদা পারভীন, সমির বাউল, যুক্তরাষ্ট্রের কিথ ই কান্ত ও ফ্রান্সের দেবরা জান্নাত (ফ্রান্স)।

বিকালে ‘বিশ্ব মানবতার মুক্তিতে লালন দর্শন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় নাট্যশালা মিলনায়তনে। সম্মেলক কণ্ঠে শিল্পীরা লালন গীতি গেয়ে শোনান। শিল্পীরা গেয়ে শোনান— এলাহি আলমিন  গো আল্লাহ বাদশাহ আলমপনা তুমি/ডুবায়ে ভাসাইতে পারো ভাসায়ে কিনার দাও কারো...।   সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির সচিব নওসাদ হোসেন। ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাউন্সিল ফর সোস্যাল ডেভেলপমেন্টের সভাপতি অধ্যাপক মুচকুন্দ দুবে। একইভাবে লালনের সমাজ ভাবনা ও বিশ্ব মানবতাবিষয়ক ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নেন লালন গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। অনলাইন আলোচনায় আরো অংশ নেন ফ্রান্সের ইনালকো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জেরিমি করডম। বাউল সংগীত সংরক্ষণ ও বিকাশ বিষয়ক বক্তব্য রাখেন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল মো. সোহেল ইমাম খান।

কে এম খালিদ বলেন, নতুন করে সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদের উত্থানকালে, মনুষ্যত্ব-মানবতার লাঞ্ছনার সময়ে, সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের বৈরী যুগে লালনের গান হতে পারে প্রতিবাদের পাথেয় এবং শান্তি ও শুভবুদ্ধির প্রতীক।

লিয়াকত আলী লাকী বলেন, বাংলা সংস্কৃতির পথরেখা বিনির্মাণের তিন পথিকৃতের একজন হলেন লালন ফকির। বাকি দুজন হলেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। আর তাদের সৃষ্টি থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পেতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এজন্যই বঙ্গবন্ধু বাউল সংগীত সংরক্ষণের বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন।

আজ শনিবার স্মরণোত্সবের দ্বিতীয় দিনেও রয়েছে সেমিনার, আলোচনা ও লালনগীতি পরিবেশনা। সাঁইজির ভাববাণী পরিবেশন করবেন টুনটুন ফকির, শফি মণ্ডল, জাপানের কয়োকো তাকাদা, শ্রীলঙ্কার সুগাত মৈত্র, পোল্যান্ডের কামিল সিজনসিড এবং জাপানের নওমি ওটানাবে (জাপান)। সন্ধ্যায় একাডেমির বাউলকুঞ্জে সাঁইজির ভাববাণী ও বাউল গান অনুষ্ঠিত হবে।