করোনাকালের লকডাউন কাটিয়ে একে একে খুলে গেছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। গত ১৭ আগস্ট থেকে খুলে গেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের হোটেলগুলো। ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলেছে বাংলাদেশের দার্জিলিং খ্যাত পর্যটনকেন্দ্র রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালি। ২৮ আগস্ট থেকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় খাগড়াছড়ির প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলো। টুরিস্টদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে কুয়াকাটা, বান্দরবান খাগড়াছড়ি, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর, মাধবকুণ্ড, সিলেটের লাউয়াছড়া, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, জাফলং ও সবুজ চা-বাগান। পর্যটকদের আনাগোনায় যেন জীবন ফিরে পেয়েছে পর্যটন স্পটগুলো। হোটেলগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করছে পর্যটকদের। তবে বাইরে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, দেখা গেছে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুললেও পর্যটকদের আনাগোনা সেভাবে বাড়েনি। অন্যান্য বছর যেমন টুরিস্টের আনাগোনা ছিল, সে তুলনায় এখন অনেক কম। ফলে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, এখন ব্যবসা চালু রাখার খরচও উঠছে না হোটেলগুলোর। তবে এটা ঠিক, করোনাকালের ঘরবন্দি জীবন থেকে মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিতে অল্পবিস্তর পর্যটকদের আনাগোনা লক্ষ করা যাচ্ছে টুরিস্ট স্পটগুলোতে। খুব শিগিগর আগের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলো জমে উঠবে বলে আশাবাদী পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
করোনা মহামারির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল পর্যটনশিল্প। সে পরিস্থিতি এখনো কাটেনি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এ খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০ লাখ জনবল বেকার হয়ে পড়েছিল। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ায় আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে রয়েছে বিস্তর বাধা।
ট্যুরিজম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাকালে টুরিস্টদের আকৃষ্ট করতে হলে হোটেলগুলোর কম খরচে টুরিস্টদের থাকতে দিতে হবে। বাস ভাড়া কমাতে হবে। এছাড়া, স্থানীয় ঘোরাফেরার জন্য যে খরচ হয় সেসবও কমিয়ে আনতে হবে। এতে টুরিস্টরা বেড়াতে যেতে আগ্রহী হবে। তা না হলে এই ক্রান্তিকালে ট্যুরিজম সেক্টর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, সহযোগিতা না পেলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েবে।
এ প্রসঙ্গে ট্যুরিজম অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, ‘কোভিডের কারণে পর্যটন খাত খুব নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিদেশি টুরিস্টরা আসেন ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে এবং বেড়াতে। সেই টুরিস্টদের আসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। এ বছরের শুরুর দিকে কিছুটা ব্যবসা হয়েছে। কিন্তু আগামী দুই বছর দেখা যাবে বিদেশি টুরিস্টরা আসতে আগ্রহী হবেন না। এই পর্যটনকে ঘিরে স্থানীয় পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট সব খাতের কর্মীরাই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
এ প্রসঙ্গে দি বেঙ্গল ট্যুরস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম নাসিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা প্রধানত বিদেশি টুরিস্টদের নিয়ে কাজ করি। আগামী বছর কোনো বিদেশি টুরিস্ট এখন পর্যন্ত বুকিং দেয়নি। মনে হচ্ছে, আগামী দুই বছর কোনো বিদেশি টুরিস্ট আসবে না। প্রধানত ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত এই ব্যবসা ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।’ নাসিম বলেন, ‘সরকারি প্রণোদনা পাওয়া যায়নি। আমরা আশা করেছিলাম এটা পাওয়া যাবে। কিন্তু না পাওয়ায় এখন অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা কর্মী কমিয়ে ব্যবসার পরিসর ছোট করে আনতে বাধ্য হচ্ছি।’ ট্যুরিজম খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। ফলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই খাত বিদেশি মুদ্রা অর্জনে ভবিষ্যতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাকের আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘করোনার প্রভাবে মানুষের ঘুরে বেড়ানোর চাহিদা কমেছে। আয়ও কমেছে। ‘সাশ্রয়ী প্যাকেজ ঘোষণা করে টুরিস্টদের বেড়াতে যাওয়ার প্রতি আগ্রহী করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া সরকারকে এই খাতের ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের কলাতলীর ডলফিন মোড়, লাবনী পয়েন্টসহ সৈকত এলাকা ও হোটেল মোটেল জোনে পর্যটকদের পদচারণা শুরু হয়ে গেছে। সম্প্রতি, কক্সবাজার ঘুরে এসেছেন পলাশ সরকার। তিনি জানালেন, পর্যটন মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও এখনো কক্সবাজারে পর্যটকের তেমন আনাগোনা নেই। এর মধ্যে কক্সবাজারে পর্যটকদের চলাচলের পথগুলোয় চলছে সংস্কারকাজ। ফলে, অনেক পর্যটকই বিরক্ত বোধ করছেন। এসব কাজ মৌসুম শুরুর সময় না করে আগেই করা দরকার ছিল বলে মত দেন তিনি।
সাগরকন্যা কুয়াকাটাতেও পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। রাজধানী বা দেশের দূরদূরান্তের পর্যটক না এলেও আশপাশের জেলা থেকে পর্যটকরা আসছেন। প্রধানত করোনাকালীন ঘরবন্দি জীবন থেকে মুক্তি খুঁজতেই সবাই ভিড় করছেন পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। জানা গেছে, ছুটির দিনগুলোতে অধিকাংশ হোটেল রুম বুকিং হয়ে যায়।
