দেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বাড়লেও এর নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে এখনো শঙ্কামুক্ত নন গ্রাহকরা। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাও থামছে না। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ এলপি গ্যাস সিলিন্ডার, বাসাবাড়িতে এর নিরাপদ ব্যবহার এবং বাজারে সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এলপিজি বোতলজাত, বিপণন, খুচরা বিক্রি থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যায়ে করণীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছে সরকার।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত বছর দেশে ৮১টি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ-দুর্ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন। অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের আবাসিক ব্যবহার কমিয়ে শিল্প ও উত্পাদনশীল খাতে তা ব্যবহার করতে চায় সরকার। এ জন্য এলপিজির যৌক্তিক দাম ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা ও করণীয় ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মূল্য নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও হয়েছে। তবে সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, এলপিজির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়েই পৃথক দায়িত্ব রয়েছে। বোতলজাতকরণ ও বিপণনে জড়িতদের এবং খুচরা বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের কিছু বিধি-নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহক সচেতনতা তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রচারাভিযানও করা হবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, পাঁচ বছর আগেও দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা ছিল ১ লাখ টনের চেয়েও কম। বর্তমানে এ চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন। এলপিজির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। তাই এলপিজির সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার বাইরে গিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে। বিস্ফোরক পরিদফতরের টহল-নিরীক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সিংহভাগ এলপিজি স্টিলের সিলিন্ডারে বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত মেয়াদশেষে এগুলো বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী তদারকি দরকার। ইতিমধ্যে সংঘটিত অনেকগুলো দুর্ঘটনার জন্য পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডারকে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সে জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই। এছাড়া এ স্টিলের সিলিন্ডার অপেক্ষাকৃত ভারী এবং মরিচাপ্রবণ। এমন প্রেক্ষাপটে স্টিল সিলিন্ডারের বিকল্প হতে পারে কম্পোজিট ফাইবার সিলিন্ডার। উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে এ ধরনের সিলিন্ডারের ব্যবহারই বেশি। স্টিল সিলিন্ডার থেকে কম্পোজিট ফাইবার সিলিন্ডারের ওজন ৫০ শতাংশ কম ও বিস্ফোরণ প্রতিরোধক। তাই গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সিলিন্ডার ব্যবহার অপেক্ষাকৃত বেশি নিরাপদ।
এদিকে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ওজনে কম এলপিজি দেওয়ার দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের। স্টিল সিলিন্ডারে ভেতরে থাকা গ্যাস বাইরে থেকে দেখা যায় না। কম্পোজিট ফাইবার সিলিন্ডার স্বচ্ছ বলে এতে থাকা এলপিজির পরিমাণও গ্রাহক কেনার সময় দেখতে পান। এছাড়া অনেক সময় রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে এলপিজি বোতল রেখে বিক্রি করা হয়। আবার অনেক সময় সাইকেলের দুপাশে বেঁধে এলপিজি সিলিন্ডার বিতরণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে পরিবহনকালে কোনো যান্ত্রিক যানের ধাক্কা লাগলেও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বিপণন পর্যায়ে এমন অসতর্ক বিষয়গুলো দূর করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নিরাপদ সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে। অন্যদিকে সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে গ্রাহকদের জানানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
