পদ যাচ্ছে প্রশাসন ক্যাডারের দখলে

আন্দোলনে যাচ্ছেন প্রকৃচিসহ ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তারা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২০, ২২:৫৮

প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিত্সক এবং ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকৌশল, চিকিত্সা ও কৃষিশাস্ত্র বিশেষায়িত শিক্ষা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও তার অধীন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদেরই রাখতে হয়। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা এসব পদ দখল করে নিচ্ছেন। এতে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিত্সক এবং ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পদ দখলের এই আগ্রাসন বন্ধে শিগিগরই কঠোর আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। বিএমএ ও স্বাচিপের নেতৃবৃন্দ আগামী সপ্তাহে সারা দেশে জেলা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ছাড়াও ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবেন তারা। 

স্বাস্থ্য খাতের চিকিত্সকের পদগুলোতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিত্সক কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিত্সকেরা। চলমান করোনা মহামারির মধ্যে চিকিত্সকেরা মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। তখন প্রশাসন ক্যাডাররা স্বাস্থ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নিয়েছেন। চিকিত্সকদের আপত্তি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সিএমএসডির পরিচালক পদে একজন অতিরিক্ত সচিবকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপপরিচালক পদে উপসচিব এবং সহকারী পরিচালক পদে সিনিয়র সহকারী সচিবকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে অপারেশন প্ল্যানে একজন উপসচিব ও একজন সিনিয়র সহকারী সচিব নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া দুটি প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক পদে দুই উপসচিবকে নিয়োগ দিয়েছে। দিনাজপুরে আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি অনুষ্ঠানে অধ্যক্ষকে উপক্ষো করে সভাপতি করা হয়েছে ডিসিকে। ঐ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন একজন যুগ্ম-সচিব। এদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর পুরোটাই দখল করে নিয়েছে প্রশাসন ক্যাডার। দেশ-বিদেশের উচ্চতর ডিগ্রিধারী অনেক নার্স থাকলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে না রেখে ননমেডিক্যাল পারসন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সেখানে বসানো হয়েছে। অথচ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ডিজি ও পরিচালকদের চেয়েও অনেক জ্ঞানী-গুণি তারা।       এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এটা সমন্বয় করে বিএমএ ও স্বাচিপ। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রশাসন ক্যাডারদের পদ দখলের এই আগ্রাসন রুখতে আন্দোলনসহ যা যা করার তা করা হবে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যার যে পেশা তাকে সেখানে রাখতে হবে। বিশেষায়িত পদে প্রশাসন ক্যাডারদের পৃথিবীর কোথাও রাখা হয় না। অথচ এদেশে প্রশাসন ক্যাডারদের ভাবখানা এমন যে প্রশাসন ক্যাডাররা ডাক্তারি, অপারেশনসহ সবকিছু করতে পারবেন। করোনার সময় ১০৩ জন ডাক্তার জীবন দেন, বেশ কয়েক জন নার্সও মারা যান। ৫ হাজার ডাক্তার-নার্স আক্রান্ত হন। এই সুযোগে তারা পদ দখলের কৌশল বাস্তবায়ন করে ফেলেছেন। এটা রাজনৈতিক সরকারকে বেকায়দায় ফেলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাধাগ্রস্ত করার অপতত্পরতা। প্রশাসন ক্যাডারের একটি অংশ সুকৌশলে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রশাসন ক্যাডাররা শুধু নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত। নিজেদের পদোন্নতি ঠিকঠাকমতো হলেও অন্যদের নানা কায়দায় আটকে রাখেন তারা। এসব চলবে না। সবার সুযোগ-সুবিধা একই থাকতে হবে।

বৈঠকে বিএমএর সাবেক সভাপতি ও মহাসচিবগণ, সাবেক ভিসিবৃন্দ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, বিসিপিএসের সাবেক সভাপতি ও সম্পাদক ছাড়াও সিনিয়র চিকিত্সকেরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।

দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তার তত্কালীন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়। সেখানে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বের বর্তমান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়ন করেননি। উলটো প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিতে তত্পর রয়েছেন। এভাবে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য সৃষ্টি করে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে প্রশাসন ক্যাডারের একটি অংশ। তারা দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।

বিএমএর বর্তমান মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একমত পোষণ করেছেন যে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আগ্রাসন রুখবই। এই আন্দোলন থেকে আমরা পিছিয়ে আসব না। কারণ পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই। স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আগ্রাসন রুখতে যে ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন, আমরা সেই ধরনের আন্দোলনে যাব।’ এদিকে নার্সিং সংগঠনের নেতারা বলেন, তারাও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবেন।