প্রকৌশলী গাজী নাসিমুর রেজা
অতি সাম্প্রতিককালে সমাজের উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ করোনায় আক্রান্ত নিয়ে সবাই চিন্তিত। সচেতন, জ্ঞানী, উচ্চবিত্ত ব্যক্তিগণের সর্বাধিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে করোনায় আক্রান্ত হলো? এক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, বাসার কর্মচারী, গাড়ির ড্রাইভার ও এয়ারকন্ডিশনের মাধ্যমে বিস্তৃত ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। দ্বিতীয়বার করোনার প্রকোপ আসার আগেই গবেষণা করে সঠিক কারণ নির্ধারণ ও প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।
কোভিড হাসপাতাল :অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে যে সাম্প্রতিককালে কোনো হাসপাতালের অংশবিশেষকে কোভিড রোগীদের জন্য আইসোলেশন কক্ষ নির্মাণ বা রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রকৌশলীগণ অনেক ক্ষেত্রে WHO-এর গাইডলাইন অনুসরণ করছেন না। এখনো ফ্লোর টাইলস, ফলস সিলিং টাইলস, স্পিলিট টাইপ এয়ারকুলার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা উচিত নয়। টাইলসের জয়েন্টসমূহে ভাইরাস তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে পুনর্জীবন লাভ করে। Health Care HVAC অনুযায়ী Negative Pressure, Proper Ventilation করা হচ্ছে না। Exhaust Fan দ্বারা ভাইরাসযুক্ত বায়ু নির্গত করার ক্ষেত্রে কোনো ফিল্টার ব্যবহার করা হচ্ছে না, যার ফলশ্রুতিতে আশপাশে ভাইরাস সংক্রমণের প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও ভারতে কেন্দ্রীয় গণপূর্ত অধিদপ্তর (CPWD)-এর নেতৃত্বে কোভিড প্রতিরোধের জন্য সময়ে সময়ে গাইডলাইন দিচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণপূর্ত অধিদপ্তর, হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক যথোপযুক্ত কোনো গাইডলাইন অদ্যাবধি পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যা অতি জরুরিভাবে করা প্রয়োজন।
শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র :Air Condition-কে বর্তমানে কোভিড ভাইরাসসহ সমস্ত ভাইরাসের বিস্তৃতি ঘটানোর যন্ত্র বলা হয়। এয়ারকন্ডিশন যন্ত্র বাতাসের আর্দ্রতা হ্রাস করার কারণে ভাইরাস বিস্তৃতিলাভে সহায়তা করে এবং বাতাসে উড়ে বিস্তার ঘটায়। আমাদের দেশে সাধারণত ভালো গুণগত বাতাসের পরিবর্তে (Good Indoor Air Quality) শুধু শীতল বাতাস (Cooling Air) বিবেচনায় এয়ারকন্ডিশন স্থাপন করা হয়, যাতে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ বাতাস বাইরে থেকে আনয়নের ব্যবস্থা থাকে না। অভ্যন্তরীণ বায়ু পরিবর্তন, বায়ুর বেগ, ফিল্টারেশন প্রভৃতির ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কক্ষের বায়ু শীতল হলেও বাইরের বায়ুর তুলনায় শতভাগ দূষিত পরিলক্ষিত হয়, যার কারণে অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রংকাইটিসসহ নানাবিধ রোগের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বর্তমানে কোভিড ভাইরাস বিস্তারে সহায়তা লাভ করে। আমার জানামতে বাংলাদেশে সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশন সিস্টেমে কোথাও বায়ু বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতি, ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসমুক্ত করার যন্ত্রপাতি সংযোজিত নাই। এক্ষেত্রে শুধু অভ্যন্তরীণ বায়ুকেই শীতল করে। করোনা রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশই লক্ষণবিহীন। Asymptotic & Pre-Asymptotic Patients)। এ ধরনের রোগীরা নিজেরাও জানে না, তারা করোনায় আক্রান্ত। সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশন ভবনে এ ধরনের রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নির্গত ভাইরাস সমস্ত ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ভবনে অবস্থানরত সুস্থ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ থাকে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত জনবহুল ভবনে বাতাসবাহিত ভাইরাস ধ্বংস করার পদ্ধতি ব্যবহূত হচ্ছে।
কোভিড বনাম ব্যবসায়ী :সারা বিশ্বে কোভিড যখন একটি আতঙ্কের নাম, তখন অনেক ব্যবসায়ীর কাছে আশীর্বাদের নাম। এই সুযোগে কতিপয় ওষুধ ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ওষুধের মূল্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন। নিম্নমানের মাস্ক, চশমা, গ্লাভস, ইউভিসি ল্যাম্প সংযোজিত যন্ত্রপাতি বাজারে সয়লাব, যার কোনো ল্যাবরেটরিক টেস্ট রিপোর্ট নাই, গুণগত মান নিশ্চিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের পণ্য উপকারের পরিবর্তে অপকার করেই থাকে।
স্বাস্থ্যবিধি ও বাস্তবতা :সরকার করোনা প্রতিরোধে প্রত্যেক জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি যেমন ঘন ঘন হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরিধান করার ব্যাপারে জনসচেতনা সৃষ্টি করছে, কিন্তু বাস্তবিকভাবে তা পালন করা হচ্ছে কি না, তার তদারকি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বড় বড় শপিং মল, অফিস-আদালত, সিনেমা হল প্রভৃতির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ করোনা ভাইরাসমুক্ত করার কোনো বিধি অদ্যাবধি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
সারা বিশ্বে কোভিড মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এই বিবেচনায় নিজেকে ভাইরাসমুক্ত রাখার জন্য নিজে সুস্থ থাকুন এবং পারিপার্শিক লোকজনকে সুস্থ রাখুন। গবেষণায় দেখা যায়, কোভিড-১৯ ভাইরাস আকৃতিতে ১২৫ ন্যানোমিটার এবং ওজন শূন্য দশমিক ৮৫ অটোগ্রাম, যা অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় বড় এবং ওজনে বেশি। সেজন্য দীর্ঘ সময় বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবধানতা অবলম্বন করলেই অনেকটা সুস্থ থাকা যেতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে করোনা রোগীকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন—ক. Symptotic Patient (লক্ষণসহ রোগী) :এ ধরনের রোগীরা নিজেরাই সচেতন থাকে। অফিস-আদালতে, শপিং মলে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে Face Mask, Temperature, Recognition Terminal স্থাপন করার মাধ্যমে ভবনে প্রবেশ বন্ধ করা সহজেই সম্ভব। খ. Asymptotic Patient (লক্ষণবিহীন রোগী) :and Pre-symptotic (আক্রান্ত কিন্তু প্রকাশিত নয়) :রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ, যাদের দ্বারা রোগ বিস্তার করার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। এ ধরনের রোগী থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। 3C (Crowded Places, Closed Spaces & Closed Contact) অনুযায়ী মাস্ক বাধ্যতামূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। আবদ্ধ স্থানসমূহে Air Purifier এবং সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনে জীবাণু ধ্বংসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদিও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, কিন্তু বহুল অংশে বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানো হ্রাস করবে। উন্নত বিশ্বে ইতিমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
n লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী,
গণপূর্ত অধিদপ্তর
