গ্রামের উন্নয়নের গুরুত্ব কম নহে

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ২০:৪৮

কবি লিখিয়াছেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’। নগরের দূষণ ও নানা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে অনেকে শেষ পর্যন্ত গ্রামেই ফিরিয়া যাইতে চাহেন; কিন্তু পারেন না। কেননা ইহার বিপরীতে রহিয়াছে একটি প্রবাদ বাক্য—‘যদিও পড়ে কহর, তবু ছেড়ো না শহর’। শহর আসলে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করিয়া জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। এইখানে আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা অধিক বলিয়া মানুষ শহরের আকর্ষণ সহজে ত্যাগ করিতে পারে না। আবার জন্মভূমি গ্রামেরও মায়া ছাড়িতে পারে না। এই সমস্যার সমাধান আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার ২০১৮-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের মধ্যেই রহিয়াছে। সেইখানে বলা হইয়াছে, ‘আমার গ্রাম—আমার শহর’ : প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগরসুবিধা সম্প্রসারণ করা হইবে। সহজ ভাষায় গ্রামের অপরূপ বৈশিষ্ট্য বজায় রাখিয়া গ্রামকে শহরে রূপান্তরের ভিশন বাস্তবায়ন করিতে হইবে। এই জন্য প্রথমেই দরকার গ্রামীণ রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।

মঙ্গলবার গণভবন হইতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একনেক সভায় বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রামীণ সড়ক আরো মজবুত করিয়া তৈরি করিবার কথা বলিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে শহরের রাস্তা ও গ্রামের রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গিটাই পূর্বে বদলাইতে হইবে। দূর করিতে হইবে বিভাজন ও বৈষম্যের পথ। একটি সংস্থার সুপারিশের কারণে গ্রামের রাস্তাগুলি বিনির্মাণের সময় আমরা এতদিন অবহেলা প্রদর্শন করিয়াছি। উন্নত দেশের গ্রামীণ রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলে কদাচিত্। কেননা সেই সকল দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে রাস্তার উপর চাপও কম; কিন্তু বাংলাদেশ আয়তনের তুলায় একটি জনবহুল দেশ। এখানকার অর্থনীতি দ্রুত বর্ধনশীল। ফলে কি শহর কি গ্রাম—সর্বত্র এখন ভারী যানবাহন চলাচল করিতেছে। এই জন্য এখন গ্রামে বেইলি ব্রিজের বদলে দরকার স্থায়ী ও পাকা ব্রিজ। দরকার আরসিসি রাস্তা। রাস্তা নির্মাণের সময় দরকার বাড়তি তদারকি। সাধারণত জাতীয় সড়ক-মহাসড়ক ও হাইওয়ে রাস্তাগুলি নির্মাণ করিয়া থাকে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা সওজ। অপরদিকে গ্রামীণ রাস্তাঘাট তৈরি করিয়া থাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি; কিন্তু এলজিইডি নির্মিত রাস্তাগুলি মানসম্মত নহে, মেরামতেও গাফিলতি বিদ্যমান। তাই কাহারও প্রেসক্রিপশন মতো না চলিয়া গ্রামীণ রাস্তাগুলি মজবুত করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে সোনার বাংলার উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী ও টিকসই হয়।

রেমিট্যান্সের কল্যাণে এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও গ্রামকে লইয়া আসিয়াছে শহরের কাছাকাছি। এমনকি আমাদের গ্রামগুলিও এখন পরিণত হইয়াছে বিশ্বগ্রামে। ইতিমধ্যে অনেক উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুত্সুবিধা ও সুপেয় পানি সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। গড়িয়া তোলা হইয়াছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কর্মসংস্থানের জন্য জেলা-উপজেলায় দরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের মাধ্যমে কলকারখানা গড়িয়া তোলা। দেশের ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিক বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখিয়া পরিকল্পিতভাবে গ্রামের উন্নয়নসাধন করা। গ্রামের নরম পলিমাটি, বর্ষার কাদা-পানি, শীতের মিষ্টি রোদ, ঘাসফুল, শিশিরের ঘ্রাণ ও জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক পছন্দকারী প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাহার অবসর জীবন গ্রামে কাটাইবার মনস্থির করিয়াছেন। গ্রামে উন্নত রাস্তাঘাটসহ সর্বপ্রকার নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ করিতে পারিলে তাহার এই স্বপ্ন দেখায় অনেকেই যে শামিল হইবেন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।