জিহাদ আল মামুন
আজকের তরুণ আগামীর অহংকার। এই তরুণের হাত ধরেই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র। কথিত আছে আজকের তরুণ আগামী দিনের দক্ষ কারিগর; বুদ্ধিদীপ্ত রূপকার। বয়সভেদে তারুণ্যের চোখেই ভিন্ন অবলীলায় ফুটে ওঠে বাবা-মায়ের স্থান। কারোর কাছে তার পরিবার, বাবা-মা, ভাইবোন নিয়েই তার সুখের পৃথিবী; আবার তেমনি কারো কাছে তার পরিবার নেহাতই অসহ্যের বস্তু। কোনো সন্তান পরিবারের পিতামাতার কাছে আশীর্বাদ আবার ঐ সন্তানই কোনো পরিবারের কাছে নেহাতই অভিশাপ। আর এক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি দখল করে আছে ‘সামাজিকীকরণ’। ‘সামাজিকীকরণ’ আমাদের জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। এর মধ্য দিয়েই মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অতিবাহিত করে। একইভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবারের গুরুত্ব নির্ভর করছে আপনি আপনার সন্তানকে কেমন সামাজিকতার স্পর্শে লালনপালন করেছেন। আপনার ভালোবাসার ঠিক কতটুকু অংশ আপনি পৌঁছে দিতে সক্ষম আপনার সন্তানের হূদয়ের গহ্বরে। আপনি যদি সফল তরুণ প্রজন্মের সাক্ষী হতে চান, তাহলে আপনাকেও এটা নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি একজন নিরেট দক্ষ এবং সফল পিতা। বাংলা প্রবাদ আছে ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়’ আবার লোকসাহিত্যে প্রচলিত একটি প্রবাদ ‘সামনের বগি যেদিকে যায় পেছনের বগিও সেদিকেই যায়’। অর্থাত্ আপনার সুস্থ সামাজিকীকরণ আপনার সন্তানের এগিয়ে যাওয়ার এক একটি সিঁড়ি।
সাধারণত ১৫-২১ বছর বয়সকে তারুণ্যের সঠিক বয়স বলা হয়ে থাকে। আর এই সময়েই সবকিছু নতুন রূপে; নতুন আঙ্গিকে ধরা পড়ে। অজানা এক নতুন গিরিপথ পাড়ি দেওয়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলে। এই সময়ে তারা ভাবতে শুরু করে তারাই সবকিছু; তারাই সর্বেসর্বা। তাদের চিন্তাভাবনার ওপরে অন্য কারোর চিন্তাভাবনার কোনো স্থান নেই। তারা যা মনে করবে তাই ঠিক, বাকি সব ভুল, মিথ্যা, কপটতা। বিশ্বাস হচ্ছে না? একবার নীরব ধ্যানমগ্নচিত্তে ভেবে দেখুন তো, এই যে দেশ পরিচালনার মূল চাবিকাঠি কে নাড়াচ্ছে? তরুণ প্রজন্ম। যে কোনো ঘটনায় দেহের তাজা রক্ত ঢেলে দিচ্ছে কে? তরুণ প্রজন্ম। মূল বক্তব্যে আশা যাক ‘তরুণের চোখে পরিবার’। তার আগে একটি উদাহরণ দিতে চাই, এই ধরুন আপনি একটা গরুকে সারাক্ষণ বেঁধে পালন করছেন; হঠাত্ একদিন সেই গরুর দড়ি ছিঁড়ে গেল। কী হবে তখন? দেখবেন চারদিক লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। সেই গরু আর আপনার কাছে ফিরতে চায় না, কারণ আপনি তাকে ভালোবাসা দিতে পারেননি; দিয়েছেন অসহ্য যন্ত্রণা ও কঠোরতা। ঠিক একইভাবে আপনি যদি আপনার সন্তানকে কঠোর শাসনের মাধ্যমে লালনপালন করেন, তাহলে কোনো এক দিন ঐ সন্তান পরিবারের বাইরেও একটা পৃথিবী আছে, সেটা দেখার জন্য বদ্ধ শিকল আর শৃঙ্খলার সীমানা পেরিয়ে চলে যাবে নিজের অজানা এক রাজ্যে। সেই রাজ্যে তখন সে তরুণ আর তার হাতেই মুষ্টিবদ্ধ সব ক্ষমতা। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে ‘I am the king of my own Kingdom’ আমার রাজ্যে আমিই রাজা। এখানে যদি সে খারাপের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তার দায়ভার আপনাকেই (পরিবার) নিতে হবে। কারণ তার লালনপালনের মধ্যে ভালোবাসার বদৌলতে সম্পূর্ণ করেছেন কঠোর শাসন দিয়ে। আগেকার দিনেও সমাজ ছিল, রাষ্ট্র ছিল কিন্তু কই এত ধর্ষণ, খুন, মারামারি, রাহাজানি, কপটতা তো ছিল না। আজ কেন এমন অবক্ষয় এত উন্নত বংশগৌরবের ধারক হওয়া সত্ত্বেও? কোনোভাবে কি আপনি দায়ী নন? হ্যাঁ আমার চোখে আপনি দায়ী হে পরিবার। আপনিই দায়ী। কারণ যখন সুস্থ পরিবেশ সুন্দর মলিনতাপূর্ণ ভালোবাসা দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে আপনি ব্যর্থ ছিলেন। তাই আজ আপনার সন্তানের চোখে আপনি দায়ী। নিজের ভেতরের সব কষ্ট অন্য কাউকে বলছে; আর না পারলে নিজের ভেতরেই দুমড়েমুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরিবেশ এবং পরিবার হতে হবে পানির মতো তরল। তরল পানি যেমন পাত্রভেদে সহজেই নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে, ঠিক তেমনি হতে হবে আমাদের পরিবার ও পরিবেশ। সুন্দর ও কঠোর উভয় প্রকার শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে আমাদের পরিবারে। তাহলেই সম্ভব একটা সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদান। স্থান পাবে ধর্ষণ, খুন, রাহাজানিমুক্ত একটা সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী। পরিবারের প্রতি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিই পারে পৃথিবীর মধ্যে শান্তির প্রবাহ বয়ে আনতে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
