প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং এর অর্জনসমূহ সমুন্নত রাখার জন্য সরকার দুর্নীতি বিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থবারের মতো পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার প্রথম কর্মদিবসে কার্যালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যদিও কোনো দেশের পক্ষেই শতভাগ দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে আমাদের সরকারের একটা দায়িত্ব হলো এই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। যাতে এটি দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে এবং আমাদের সকল সাফল্য ম্লান করে না দেয়।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি ও মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রে আমাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। টেন্ডার ছিনতাইয়ের ঘটনা দেশে বারংবার ঘটেছে; কিন্তু আমরা দেশকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে পেরেছি। প্রযুক্তির বদৌলতে এই সাফল্য এসেছে এবং এটা ডিজিটাল বাংলাদেশের একটা ভাল ফল।
জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণে কাজ করার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যে ওয়াদা আমরা জাতির কাছে দিয়ে এসেছি সেটা বাস্তবায়ন করতেই হবে। এটা করতে হলে কাজ করতে হবে। সেজন্য নির্বাচনী ইশতেহারকে আমরা গুরুত্ব দেই। ক্ষমতাটা শুধু চেয়ারে বসে ভোগ করা নয়, এটা জনগণের কাছে দায়িত্ববোধ। এ জন্য আমাদের এই অফিসটা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্ব কিন্তু অনেক বেশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতেও নিজের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি অনুরোধ করব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আমরা যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছি, সেগুলো বাস্তবায়ন করা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশে শান্তি, নিরাপত্তা রক্ষা করা। তিনি নিজেও আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন শুরু করবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জানা গেছে, আগামী ১৭ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ২৩ জানুয়া?রি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রী।
মতবিনিময়কালে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ২১ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল, আমরা ১০ বছরে যা উন্নতি করতে পারলাম, তারা কেন তা করতে পারেনি। এ প্রশ্নের উত্তর যখনই খুঁজতে যাই তখনই মনে হয়, আসলে যারা স্বাধীনতাই চায় নাই তারাতো আর দেশের উন্নতি করবে না। করতে চায় না। তাদের কাছে ক্ষমতা ছিল একটা লোভের মতো।
অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বয়স ‘খুবই নতুন’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে ২০০-৩০০ বছর ধরে গণতন্ত্র চর্চা করে আসছে। তাদের ওখানেও কি গোলমাল হয় না? গোলমাল আছে, দ্বন্দ্ব আছে সবই আছে। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী। তারপরও আমরা সেই মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করছি। আর কখনো যেন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে না পারে সেই প্রত্যাশা রেখে শেখ হাসিনা বলেন, যারাই আসুক স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি যেন হয়। স্বাধীনতার চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাস করবে। স্বাধীনতার চিন্তা-চেতনাই বিশ্বাস করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের প্রতি
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
টানা তৃতীয় বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সকালে ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শিখা অনির্বাণে পৌঁছলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল মো. নিজাম উদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাশিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর নতুন মেয়াদে দায়িত্ব পালনে এদিনই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে তার প্রথম অফিস করেন। শেখ হাসিনা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পৌঁছলে তাকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মহাপরিচালক অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
দেশের সার্বিক উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনীর
অধিকতর অংশগ্রহণ চান প্রধানমন্ত্রী
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সার্বিক উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনীর অধিকতর অংশগ্রহণ চেয়েছেন। গতকাল সকালে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (এএফডি)’র মাল্টিপারপাস হলে এএফডির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে আরো বেশি অংশগ্রহণ দরকার।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হবার পর এএফডিতে প্রথম দিন অফিস করতে গিয়ে তিনি তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহ্্সানুল করিম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৫ বছরে সরকারের লক্ষ্য হবে বিগত মেয়াদে গৃহীত সকল মেগা প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা।
একটি দেশে প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি-সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আক্রান্ত হলে দেশকে রক্ষা করতে পারার জন্য আমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নিজাম উদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লে. জেনারেল মাহফুজুর রহমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
নতুন সরকারের প্রতি ওআইসি
দেশগুলোর পূর্ণ সমর্থন
ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সকল দেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে প্রতিটি ক্ষেত্রে এ সরকারের সাফল্য কামনা করেছে।
বাংলাদেশে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতগণ প্রধানমন্ত্রীকে তার দলের নির্বাচনী বিজয় এবং টানা তৃতীয় বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার নবগঠিত সরকারকে শুভেচ্ছো জানাতে ওআইসিভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতগণের ১৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে আসেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দানকারী ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান বলেন, ‘আমরা সকল মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূতগণ একত্রে গণভবনে এসে আপনার অবিস্মরণীয় বিজয়ে আপনাকে (প্রধানমন্ত্রী) শুভেচ্ছা জানাতে পারায় গভীর সম্মানিত বোধ করছি।’
কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মিশর, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, তুরষ্ক, কুয়েত, মরক্কো, মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত এবং ইরাক, ওমান, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্সগণ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। রাষ্ট্রদূতদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা তার সরকারকে অব্যাহত সহযোগিতার জন্য ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাজ্জাদুল হাসান এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
