করুণাময়ীর করুণায় মুক্ত হোক করোনা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪২

গৌরমোহন দাস

এ বছর কোভিড-১৯, করোনার ভয়াবহতা গোটাবিশ্ব দেখেছে! ভাবতেও কষ্ট হয়! এখনো কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত আছে, হচ্ছেও। আবার সামনে আসছে শীতকাল। আমাদের বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে—শীতের সময়। শীতে করুণার প্রকোপ বাড়বে এ ভয়ের মধ্যে আমরা উদ্যাপন করছি—করুণাময়ী শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা। শ্রীশ্রী গীতায় (৭/১৬) আছে—মানুষ বিপদে পড়লে, রোগে জর্জরিত হলে সৃষ্টিকর্তার নাম নেয়, করুণাময়ের করুণা প্রার্থনা করে। শ্রীশ্রী চণ্ডীতেও আছে—সুরথ রাজা রাজ্য হারিয়ে, সংসার হারিয়ে, মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় পেয়েছিলেন। মেধস মুনির আদেশে তারা শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা করেন এবং দেবীর কৃপা লাভ করে তাদের হারানো রাজ্য/সংসার ফিরে পেয়েছিলেন।

অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী যখন অতিষ্ঠ। শান্তিপুরী স্বর্গ থেকে দেবতাগণ হন বিতাড়িত। কোনোভাবেই যখন তারা মুক্তির উপায় পাচ্ছিলেন না, তখন অসহায় দেবতাগণ ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) ও মহেশ্বরের (ধ্বংসকর্তা) শরণাপন্ন হন। শেষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ত্রিশক্তির সম্মিলিত তেজরাশি থেকে এক নারীর আবির্ভাব হয়। তিনিই হলেন দেবী দুর্গা। মার্কণ্ডয়ে পূরাণ মতে ‘দুর্গম’ নামক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। এছাড়াও দেবী দুর্গার বহু নাম। আমাদের দুর্গতি থেকে রক্ষা করেন বলে— দুর্গতিনাশিনী, দুঃখ যন্ত্রণায় করুণা করেন বলে করুণাময়ী, আমাদেরকে আনন্দ দান করেন বলে আনন্দময়ী, জীবকে পাপ থেকে মুক্ত করেন বলে তিনি পাপনাশিনী, সবকিছুতে শুভ বা মঙ্গল করেন বলে শুভঙ্করী এমনিভাবে মহামায়া, মহিষাসুরমর্দিনী, ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী ১০৮ নামে অভিহিতা তিনি।

আমরাও কেউ কোনো দিন দুঃখ চাই না, জরা-ব্যাধি চাই না; চাই সুখে থাকতে, আনন্দে থাকতে। তাই তো আনন্দময়ী মা দুর্গার পূজার আয়োজন। ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।’ পূজা মানেই পবিত্র উপাচারে জপ আরাধনা। তাই তো এ পূজার আয়োজনে সর্বদাই ব্যাপকতা। কলি যুগের দুর্গাপূজা যেন অশ্বমেধযজ্ঞ (বিরাট আয়োজন)! পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ তত্কালীন ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এবং আভিজাত্য ও অর্থের প্রতিযোগিতায় ভাদুরিয়ার রাজা জগত্নারায়ণ ৯ লাখ টাকা ব্যয় করে শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা করেন। তখন থেকে এ পূজা উপলক্ষ্যে আলোকসজ্জা, যাত্রাপালা, নাচ-গানের যুক্ততা! বর্তমানে অনেকেও আবার পূজার আধ্যাত্মিকতার অংশটুকু বাদ দিয়ে প্রতিযোগিতায় দুর্গাপূজার রকমারি অনুষ্ঠান চালায়! এমনকি ধ্যানমন্ত্রে দেবীর রূপের বাহিরে নিজস্ব কল্পনায় কেউ কেউ নায়িকার আদলে প্রতিমা তৈরি করেন! এ বছর তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দুর্গাপূজায় দেবীর মূর্তি-করোনার আদলে তৈরি করতে দেখা যায়! কিন্তু আমরা যা করি তা যদি জেনে, বোঝে করুণাময়ী মায়ের পূজা করি, যথার্থ শ্রদ্ধা-ভক্তিতে মায়ের নিকট প্রত্যাশার আবেদন রাখি, তাহলে মানবিক মুক্তি ও প্রত্যাশার পূরণ বেশি হবে নিঃসন্দেহে। শুরুতেই আমরা এবারের পূজার প্রেক্ষাপট বলেছি— কেবল মন্দিরে পূজা করা, পূর্বের ন্যায় ব্যাপক জনতার মধ্যে প্রসাদ বিতরণ না করা, বিজয়ায় শোভাযাত্রা না করার নির্দেশনাকে মেনে নিয়ে করোনাকালীন অনুষ্ঠিত হচ্ছে শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা। তাই পূজার আনন্দ ও প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে আমরা যেন সরকারি নির্দেশনাকে কোনোভাবেই অমান্য না করি! এ বছর অবশ্যই পূজায় আমাদের সবারই মাথায় রাখতে হবে, পালন করতে হবে নিজের স্বার্থে, নিজেদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে সরকারি নির্দেশনা। এ করোনাকালের দুর্গাপূজায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে, মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের হূদয় ও মন দিয়ে মন্দিরে মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন—দেবী দুর্গা। কৃষি সম্প্র্রসারণ তথা প্রকৃতি পূজার উপকরণ- কলা, কালোকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, ধান ৯টি ঔষধি বৃক্ষ এবং পঞ্চরবিশস্য এ প্রকৃতির পশু-পাখির সর্বত্র ঈশ্বর দর্শন করে এবং সে সবের গুণাগুণ বিচার করেই তাদের রক্ষার্থে, প্রকৃতির প্রতি দয়াশীল হওয়ার জন্যই আর্য-ঋষিগণ পূজার বিধান তথা প্রকৃতিকে রক্ষার বিধান দিয়েছেন। দুর্গা দেবী ও প্রকৃতির কৃষিজাত শস্যাদি, গাছপালা, লতাপাতা, শাকসবজি নষ্ট হওয়া থেকে পৃথিবীবাসীকে রক্ষা করে ‘শাকম্ভরী’ হয়েছিলেন। ডাইরেক্টরী পঞ্জিকায় বলা হয়েছে—এবার দেবীর দোলায় আগমন; এর ফল শুভ নয়, মড়ক। গজে গমন; ফল শুভ, শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা—এ কথার প্রতিফলন হোক। করুণাময়ী মায়ের নিকট প্রার্থনা—দেবীর দ্বারা অসুর তথা অশুভ শক্তির বিনাশে শুভ শক্তির বিজয় হোক। মা করুণাময়ী! শিগিগরই অশুভ শক্তি করোনা মুক্ত করো এ পৃথিবী। আমরা যেন আবার আগের মতো সকলে একসঙ্গে চলতে পারি। সকলের মন্ত্র, সংকল্প ও মন এক হোক, এক হোক, এক হোক। সর্বমঙ্গলময়ী মা দুর্গার কাছে সবার মঙ্গলের জন্য শ্রীশ্রী চণ্ডীর স্তূতিতে (১১/১০)প্রার্থনায় প্রণাম জানাই—সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। /শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমো হস্তুতে

n লেখক :সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দুসমাজ সংস্কার সমিতি