জীবনের শেষ প্রান্তে নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ২২:০২

অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম

আইন অঙ্গনের দিকপাল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আমার সিনিয়র ছিলেন। সৌভাগ্য হয়েছে ২৬ বছর তার সঙ্গে কাজ করার। এই কাজ করতে গিয়ে সব ধরনের আলোচনাই স্যার করতেন। তিনি বলতেন, আইনজীবীদের কখনো রাজনীতিতে জড়ানো ঠিক নয়। আইনজীবীদের রাজনীতিতে জড়াতে পছন্দ করতেন না। তার কাছে আইন হচ্ছে বিজ্ঞানচর্চার একটি বিষয়। এখানে শুধু অধ্যবসায় করতে হয়। রাজনীতি ও আইন পেশা একসঙ্গে করলে কোনোটিই ভালোভাবে করা যায় না। তিনি আমাকে সব সময় নিরুত্সাহিত করতেন রাজনীতিতে না জড়ানোর জন্য। যদি বলো রাজনৈতিক মতার্দশ কী? জীবিত অবস্থায় কখনো উচ্চারণ করেননি তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য। কারণ তিনি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি  ছিলেন। এদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া মানসিকভাবে কাউকে কোনো স্বীকৃতি দেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে আলোচনার সময় তিনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যেতেন। সব সময় বঙ্গবন্ধুর সিংহহূদয়ের কথা আমাদের বলতেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সব সময় অন্যরকম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।

আমার স্যার একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আজীবন চেয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এবং পরিচালিত হোক। ধর্মীয় গোঁড়ামিকে তিনি অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখতেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের ব্যাপারে অত্যন্ত ঘৃণাবোধ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের যে রায়ে গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, সেই রায় তিনি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে পড়েননি। তিনি সব সময় বলতেন, ‘আমি সব রাজনৈতিক দলের মামলা করতে পারি, কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের মামলা কখনো করব না।’

স্যারকে কখনো কোনো উপন্যাস পড়তে বা গান শুনতে দেখিনি। তবে মান্না দের কোনো কোনো গানের এক-দুটি লাইন মাঝেমধ্যে গেয়ে উঠতেন। আইনের বই কেনার প্রতি তার অদ্ভুত নেশা ছিল। যেখানেই যেতেন, বিশেষ করে দেশের বাইরে গিয়েছেন কিন্তু আইনের বই কেনেননি, তা হয়নি কখনো। তিনি খুব পশুপ্রেমী ছিলেন। তার একটি ব্ল্যাক ল্যাবরাডার জাতের কুকুর ছিল। তিনি নিজেই ওটাকে গোসল করাতেন। একবার সেই কুকুরটি হারিয়ে গিয়েছিল। সেজন্য আমি তাকে কাঁদতে দেখেছি। আর যখনই কোনো কুকুর-বিড়াল গাড়ির সামনে পড়ে যেত, তখন তিনি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলতেন, যেন চাপা না পড়ে। স্যারের অনেক ক্লায়েন্ট বিদেশি পাখি নিয়ে আসতেন দেওয়ার জন্য। কিন্তু স্যার ওগুলো না রেখে মুক্ত করে দিতেন।

তিনি কখনো মানুষের প্রতি মানুষের কোনো ভেদাভেদ করতেন না। বেশ আগে তার বাসার একজন কাজের ছেলে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। তার জন্য ওনাকে আমি বছরের পর বছর কাঁদতে দেখেছি। বাড়ির কাজের ছেলেমেয়েদের ভাইবোনের বিয়েতে কখনো ফরিদপুর, কখনো বরগুনা পর্যন্ত যেতে দেখেছি। স্যারের জুনিয়রদের ব্যাপারে, বিশেষ করে আমার ব্যাপারে তিনি অনেক খেয়াল রাখতেন। আমার ব্যক্তিগত জীবনে অবলীলায় হস্তক্ষেপ করতেন। এই হস্তক্ষেপ ছিল আমার মঙ্গলের জন্য। আমার সন্তানের বয়স যখন দুই বছর, তখন আমার স্ত্রী চাকরি করতেন। স্যার আপাকে (ডা. ফরিদা হক) নিয়ে আমার স্ত্রীকে বুঝিয়েছিলেন যে এই সময়ে চাকরি করা ঠিক হবে না। চাকরি করলে এই শিশু সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারবে না। এরপর আমার স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমার মেয়ের জন্মের সময় স্যার তার স্ত্রীকে নিয়ে দিনরাত হাসপাতালে সময় দিয়েছেন, এখন ভাবতে অবাক লাগে।

রফিক-উল হক তার সমসাময়িক আইনজীবীদের নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করতেন। সেগুলো আমাকে বলতেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ সম্পর্কে স্যারের (রফিক-উল হক) প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা ছিল। বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার সময় যখন পুরোনো ডিসিশন বের করতাম, তখন বারবার বলতেন একটা কথা যে ইশতিয়াক ভাই এত কম বয়সে এই মামলাগুলো কীভাবে করতে পেরেছেন! এত ট্যালেন্ট তিনি কোথায় পেয়েছিলেন! এত কৌতূহলী মন তিনি কীভাবে পেয়েছিলেন! স্যার অনেকটা আশ্চর্য হতেন। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম সম্পর্কে বলতেন, তিনি যে পরিমাণ জ্ঞানের অধিকারী, সেই জ্ঞান যখন চারদিকে ছড়াবে, তখন দেশ বুঝবে তিনি কতটা মেধাবী আইনজীবী। আইনের কত বড় পণ্ডিত।

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ সম্পর্কে বলতেন, ‘সে হলো আমার মতো। যে কিনা সব সময় নতুন কিছু করতে চায়। সীমাবদ্ধতার মধ্যে না থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে উন্মুখ। প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম নূরুল্লাহ সম্পর্কে আমাকে বলতেন, ওনার সঙ্গে মামলা করার সময় সতর্ক থাকবে। ও কিন্তু মামলা জেতার সমস্ত কায়দাকানুন জানে। ওর সঙ্গে মামলা জিততে হলে ষষ্ঠেন্দ্রিয় খোলা রাখতে হবে। অর্থাত্, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খুব শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ড. এম জহীর সম্পর্কে স্যারের একধরনের প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকলেও তা ছিল শ্রদ্ধার জায়গায়। অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ সম্পর্কে বলতেন যে ওনার জন্য কোনো ডিসিশন লাগে না। তিনি যখন কোনো মামলা পরিচালনা করেন, সেই মামলাই ডিসিশন হয়ে যায়।

দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করা স্যারের খুব শখ ছিল। দেশের মধ্যে অনেক জায়গায় তিনি জুনিয়রদের নিয়ে গিয়েছেন। সাগরে নেমে আনন্দ করতে পছন্দ করতেন। দেশের বাইরে গিয়ে স্যারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় থেকেছি। লন্ডন থেকে ওয়েলস পর্যন্ত গিয়েছি কিংবা কখনো প্যারিস থেকে অন্য দেশে গিয়েছি। তিনি গাড়িতে সব সময় চিপস খেতে পছন্দ করতেন। আর ভালোবাসতেন ক্রিকেট খেলা। শচীন টেন্ডুলকারকে পছন্দ করতেন। নিয়মিত আইপিএলের খেলা দেখতেন। ভক্ত ছিলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ক্লায়েন্টদের মধ্যে সবচেয়ে ভালোবাসতেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানকে। তিনি কখনো তাকে ক্লায়েন্ট মনে করতেন না। ওনাকে তিনি ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। এ কথা সবারই জানা ছিল যে বেক্সিমকো গ্রুপের মামলা হলে তিনি সেটাকে পারসোন্যালি নিয়ে নিতেন। এ কারণে বিভিন্ন লইয়ারের সঙ্গে তাকে বিবাদ করতে দেখেছি। এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ভালো বলতে পারবেন। জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকেও অনেক পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন।

স্যারের জুনিয়রদের মধ্যে বিচারপতি এম তাফাজ্জল ইসলামকে (সাবেক প্রধান বিচারপতি) খুব শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। বলতেন বিচারালয়ে তার একাগ্রতার কথা। ব্যারিস্টার জাফরুল্লাহকে খুব ভালোবাসতেন। 

রফিক-উল হক খুব হইহুল্লোড় পছন্দ করতেন। কখনো একা থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি জুনিয়রদের বেডরুমে ডেকে নিয়ে গল্প করতেন। এতে আপা (ডা. ফরিদা হক) বিরক্ত হতেন, কিন্তু মুখ ফুটে কখনো কিছু বলতেন না। যে মানুষটা এত মানুষের সঙ্গ পছন্দ করতেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকে বেশ কটি বছর একদম নিঃসঙ্গ থাকতে হয়েছে। যে মানুষটির কাছাকাছি মানুষ না থাকলে অস্থির হয়ে যেতেন, তিনি শেষ জীবনে মানুষের সাহচর্য পছন্দ করতেন না।

স্যার খুব দ্রুত হাঁটতে পারতেন। আমরা কখনো তার সঙ্গে হেঁটে আগে যেতে পারতাম না। এমনকি দেশের বাইরে গিয়ে তিনি ক্লান্তিহীনভাবে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়াতেন। তার কোনো ক্লান্তি ছিল না। বয়সকালে তার হাঁটুতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ সময় কষ্ট করে তাকে হাঁটতে হতো। তিনি দেশেই হাঁটুর অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। আমি বারবার বারণ করেছিলাম। তিনি শোনেননি। তার হাঁটুর অস্ত্রোপচার সফল ছিল না। এরপর থেকে তিনি হাঁটতে পারতেন না। জীবনের বেশ কিছু বছর তাকে হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়েছে। তিনি খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষ ছিলেন। দামি কাপড়চোপড় পরতেন না। ব্র্যান্ডের পোশাক তাকে কখনো পরতে দেখিনি। সত্যি বলতে, তিনি কৃচ্ছ্রতা সাধন করতেন। জীবন চালানোর জন্য যা একেবারে না নিলেই নয়, সেভাবেই তিনি জীবন-যাপন করতেন। তার তেমন কোনো দামি গাড়ি ছিল না। তার জীবনযাপনের মান যথেষ্ট সাধারণ ছিল। বাড়িতে দামি দামি ফার্নিচার ছিল না। স্যার সব সময় বলতেন, অতিরিক্ত ব্যয় মানুষকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ের কথা বলি, তাহলে আমার সৌভাগ্য হয়েছে দিনের পর দিন তার সঙ্গে কাজ করার। কাজ করতে করতে আমাদের সব ধরনের আলোচনাই হতো। আমি স্যারের একজন গুণমুগ্ধ ছিলাম। তার সবকিছুই আমার ভালো লাগত। স্যারের হাতের লেখা মুক্তাক্ষরের মতো ছিল। আমি নিরলসভাবে তার মতো করে হাতের লেখা লেখার চেষ্টা করতাম। কখনো তিনি তার নিজের হাতের লেখার সঙ্গে আমার লেখার পার্থক্য খুঁজে পেতেন না। আমার প্রতি স্যারের ছিল এক অদ্ভুত ধরনের নির্ভরশীলতা। তিনি নিজে কোনো কিছু লিখে অধিকাংশ সময় আমাকে বলতেন তুমি লিখে দাও। তার বিশাল এক উদার মন ছিল। কখনো স্যারের লেখা অধিক হারে এডিট (সম্পাদনা) করার পর তিনি কখনো বলতেন, তুমি তো আমার লেখার কিছুই রাখলে না। স্যারের মতো এত উঁচুমানের আইনজ্ঞের লেখার ওপর হাত দেওয়াকে তিনি কখনো ‘ইগোর’ চোখে দেখেননি বরং প্রশয় দিতেন। তিনি সব দিকে চোখ খোলা রাখতেন। চেম্বারের কোনো জুনিয়র বা কোনো স্টাফের আর্থিক সমস্যা যাচ্ছে কি না, কেউ অসুস্থ আছে কি না, কারো বাড়িতে সমস্যা আছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এমনও অনেক সময় গেছে, আমি অসুস্থ, তিনি এবং তার স্ত্রী ঠিকই সময় করে আমাকে দেখতে এসেছেন। এমন কোনো ঈদ যায়নি, যে ঈদে তিনি আমার স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনে আনেননি। দেশের বাইরে গেলে আমার জন্য কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে এসেছেন।

আমার সিনিয়র রফিক-উল হক নিজে খেতে পারতেন না। কারণ ক্যানসারের কারণে তার খাদ্যনালি ছোট করে দেওয়া হয়েছিল। পাকস্থলির পরিধিও সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হয় তখন। কিন্তু একসঙ্গে অনেক খাবার দেখলে তিনি খুশি হতেন। কিন্তু তিনি খেতে পারতেন না। তবে সবাইকে খাওয়ার জন্য বলতেন। স্যার কাঁকড়া খেতে খুব পছন্দ করতেন। মৃত্যুর আগেও আমাকে ফোন করে কাঁকড়া খেতে চেয়েছিলেন। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে কাঁকড়া পাওয়া যায়নি। তবে তার জন্য কাঁকড়া জোগাড় করা হয়েছিল। কিন্তু যেদিন কাঁকড়া আমাদের হাতে আসে, সেদিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এই জীবনে আর তার কখনোই কিছু খাওয়া হবে না।

একজন রফিক-উল হক শুধু এদেশের একজন সেরা আইনজীবীই ছিলেন তা নয়, তিনি একজন সেরা শিক্ষক, সেরা মানুষ এবং সর্বোপরি তিনি একজন শ্রেষ্ঠ পিতা। স্যারের চলে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে আমি আমার পিতাকে হারিয়েছি। পিতার কাজ তার পুত্রের পায়ের মাটি শক্ত করে দেওয়া। তিনি তার সব জুনিয়রের পায়ের মাটি শক্ত করে দিয়েছেন। সময় চলে যাবে, আমার সিনিয়রের কবরের মাটিও একদিন শুকিয়ে যাবে। কিন্তু আমি যত দিন বেঁচে থাকব, আমার চোখের জল শুকাবে না। মনে হয় আর কিছুদিন পেলে ওনাকে সেবা করার সুযোগ পেতাম। ওনার চিরবিদায়ে সেই সুযোগ আর কখনো আসবে না।

n লেখক :আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট