কাহারও যদি স্মার্টফোন না থাকে, কেহ যদি বোতামযুক্ত অতি সাধারণ বেসিক মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং যদি তিনি প্রযুক্তিতে আনাড়ি হন, তাহা হইলে তিনিই ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভিএএস) প্রোভাইডারদের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু। সাধারণত মধ্যরাতে তাহার মোবাইলে এই তথাকথিত নিউজ অ্যালার্ট, ওয়েলকাম টিউনসহ নানা ধরনের সেবার নামে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস চালু করিয়া দিতেছে তাহার সম্মতির তোয়াক্কা না করিয়াই। তিনি জানিতেও পারিতেছেন না তাহার ফোনে ওয়েলকাম টিউন চালু হইয়াছে, অন্তত যতক্ষণ না কেহ কল করিয়া কলারটিউনে গান শুনিয়া সেই কথা না জানায়। যাহারা ইহা বন্ধ করিবার নিয়ম জানেন, তাহাদের মাধ্যমে হয়তো অনেক কাঠখড় পুড়াইয়া সার্ভিসটা বন্ধ করা হইল। কিছুদিন পর আবার তাহার অজান্তে উহা চালু হইয়া গিয়াছে। লক্ষ লক্ষ অতি সাধারণ ও আনাড়ি গ্রাহক এই ধরনের প্রতারণার শিকার হইতেছেন। আর নিউজ অ্যালার্ট, বিউটি টিপস, মজার জোকসের নামে যাহা মাসিক ভিত্তিতে চালু করিয়া দেয়, তাহার গরিব গ্রাহকদের নিকট অনেক টাকা। অনেকের মোবাইলেই পর্যাপ্ত ব্যালেন্স থাকে না; কিন্তু ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস চালু হইবার মতো টাকা তাহার মোবাইলে রিচার্জ করিলেই মধ্যরাতের পর কোনো একসময় কোনো একটি ভ্যাস সম্মতি ছাড়াই চালু হইয়া যায়। গ্রাহক ইহার পর কাউকে ফোন করিবার সময় শুনিতে পারেন—আপনার মোবাইলে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স নাই।
কথায় আছে, খলের ছলের অভাব হয় না। খলরূপী বহু ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস প্রোভাইডার এই ধরনের নিকৃষ্ট প্রতারণার আশ্রয় লইতেছেন বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া। জানা গিয়াছে, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মোবাইল ব্যবহারকারী ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের (ভিএএস বা ভ্যাস) গ্রাহক! অথচ সিংহভাগ মোবাইল ফোন গ্রাহকই এই সার্ভিসগুলি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন নাই। এমন ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি প্রকাশ পাইয়াছে বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) নিজস্ব তদন্তে। বিটিআরসি হইতে লাইসেন্স পাইবার পর এই সকল ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস প্রোভাইডার মোবাইল অপারেটরদের সহিত যুক্ত হয়। এই সেবাগুলি হইতে প্রাপ্ত অর্থের অংশ মোবাইল অপারেটর, সরকার ও ভিএএস প্রতিষ্ঠানগুলি পাইয়া থাকে। মোবাইল নেটওয়ার্কের সহিত যুক্ত রহিয়াছে শতাধিক ভ্যাস প্রতিষ্ঠান। ইহাদের মধ্যে মাত্র দুইটি প্রতিষ্ঠানের ছয় মাসের কার্যক্রম অনুসন্ধান করিয়া বিটিআরসি চমকাইয়া গিয়াছে। তদন্তে উঠিয়া আসিয়াছে গ্রাহকদের সহিত প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়—একটি প্রতিষ্ঠান গত আগস্ট মাসে সাড়ে ৩ লক্ষের অধিক গ্রাহকের মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের সেবা চালু করিয়াছে। অথচ বিটিআরসির অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, এই সার্ভিসগুলি চালুর পূর্বে সংশ্লিষ্ট ভ্যাস প্রোভাইডার একজন গ্রাহকের নিকট হইতেও সম্মতি গ্রহণ করে নাই। জানা গিয়াছে, দেশে টেলিকম খাতে ভিএএস বাজারের আকার প্রায় শত কোটি টাকা।
আশার কথা হইল, গ্রাহক-স্বার্থ রক্ষায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভ্যাস সক্রিয় করিতে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবহার করিতে নির্দেশ দিয়াছে বিটিআরসি। তবে আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে বিদ্যমান সকল ভ্যাস বন্ধ করিয়া তাহার পর ওটিপির মাধ্যমে গ্রাহকের সম্মতি গ্রহণ করিয়া উহা চালুর ব্যবস্থা রাখা উচিত। সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীদের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করিবার ফাঁকফোকর বন্ধ করিতেই হইবে।
