খন্দকার হাবীব আহসান
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তীরে গড়ে উঠা এই জনপদের পলিমাটি বিজ্ঞানের সম্ভাবনাময়ী চারা যে জন্ম দিতে পারে সে খবর মিসিসিপি-কঙ্গো-রাইনের স্রোতধারা থেকেও জানা যায়। এই বাংলায় জন্ম নিয়েই আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু সর্বপ্রথম উদ্ভিদে প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন। শুধু পাটকাঠি থেকে পারটেক্স কাঠই নয়, শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-এ-খুদার আবিষ্কারের পেটেন্ট ১৮টির অধিক।
পার্টিকেল স্ট্যাটিস্টিক্স নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর রয়েছে জগদিবখ্যাত গবেষণা, মারকিউরাস নাইট্রাইটসহ ১২টি যৌগিক লবণ ও পাঁচটি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেছেন পি সি রায়। পরমাণু বিজ্ঞান, আয়নমণ্ডল,পঞ্জিকা সংস্কারসহ জ্যোতিঃপদার্থ বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন মেঘনাদ সাহা। আণবিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া।
সময়কাল তুলনায়, আগের চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানের উদ্ভাবনে বাঙালিরা পূর্বের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যেতে পারেনি এটা সত্য। তবুও নাসা ইউনাইটেড টেকনোলজিস এবং অ্যালস্টমে কাজ করার সময় ৪০টির বেশি সংকর ধাতু আবিষ্কারের মাধ্যমে উড়োজাহাজ ও ট্রেনের ইঞ্জিন হালকা করে উড়োজাহাজ উড্ডয়নে ও ট্রেনের গতি বৃৃদ্ধির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে বিজ্ঞানী আব্দুর সাত্তার খান। চিকিত্সা বিজ্ঞানে গবেষণা করে কলেরা রোগের কারণ আবিষ্কার করেছেন ডা. শাহ এম ফারুক। পাটের জিনতত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন ড. মাকসুদুল আলম, বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর সৌরবিদ্যুত্ কোষ আবিষ্কার করেছেন ড. জামালউদ্দিন। বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম কিডনি আবিষ্কার করেছেন শুভ রায়। মহাবিশ্বের উদ্ভব ও মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও বিশ্বতত্ত্ববিদ জামাল নজরুল ইসলাম। জগদিবখ্যাত সবাই এই বাংলার ধূলিমাখা পথ পেরিয়েই বিশ্বজয়ী বিজ্ঞানী হয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বের অগ্রগতির সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা বিবেচনা করলে বিজ্ঞান শিক্ষা তথা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, বিজ্ঞানের উত্পাদনমুখী গবেষণা এবং কার্যত বিজ্ঞান প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার ছাড়া উন্নয়ন অগ্রগতি অসম্ভব। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ৫০ বছর আগে উন্নয়নের মাপকাঠিতে আমাদের কাতারে থাকলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উত্পাদনমুখী অগ্রাধিকার দিয়ে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকার অগ্রসরমান হওয়ার পর থেকে শিক্ষা খাতসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে উদ্ভাবনী মেধাসম্পন্ন তরুণদের বিকশিত করে প্রযুক্তি খাতে স্বনির্ভর না হতে পারলে আমাদের আগামী প্রজন্ম প্রযুক্তিগত পরাধীনতার শেকল পরতে হবে।
রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আগের তুলনায় আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছি রাষ্ট্রীয় দপ্তর পরিচালনার ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কল্পিত স্বপ্ন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের ধারণা এই পরিবর্তনের ম্যাজিক। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল অর্থনৈতিক উন্নয়নে শীর্ষ চারে জায়গা করে নিয়েছে, বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতে অভাবনীয় বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। এমনকি প্রযুক্তি খাতে দ্রুত অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের মধ্যে বর্তমানে অন্যতম একটি দেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ।
প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থাসহ অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করেছে বর্তমান সরকার। এটি অস্বীকারের সুযোগ নেই তবে এ সব সুযোগের সদ্ব্যবহার হওয়া রাষ্ট্রের একটি চ্যালেঞ্জ।
শিশু-কিশোর-তরুণদের বিজ্ঞান প্রতিভার অঙ্কুরটি যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভ্রূণেই অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় নষ্ট না হয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৃজনশীল উদ্ভাবনের ইতিবাচক ব্যবহারের চেয়ে নেতিবাচক ব্যবহার রোধ করা যায় সেই নজরদারি বাড়াতে হবে।
‘সম্ভব না’ থেকেই আমরা সম্ভাবনার যেমন স্বপ্ন দেখি তেমনি রাষ্ট্রীয় সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এই তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণকে উদ্ভাবনী মেধাশক্তিতে পরিণত করার মাধ্যমে আমরা নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা দেখতে পারি। আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত সৃজনশীল উদ্ভাবন ও ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত হলে আগামীর বাংলাদেশ হবে বিজ্ঞান বিপ্লবের মাধ্যমে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার মডেল রাষ্ট্র।
এরই মধ্যে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের কাজের অগ্রগতি প্রশংসনীয় এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তথ্য ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ভীষণ প্রবল। আমাদের এই প্রজন্মের সুচিন্তিত বিজ্ঞান চিন্তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী প্রতিভার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুযোগের সমন্বয় ঘটলেই বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতই হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার গুড ডিল। প্রযুক্তিগত পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে এখনই বিজ্ঞান বিপ্লবের উপযুক্ত সময়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
