অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট

অপারেশনের জন্য বেডে থাকতে হচ্ছে দুই মাস

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:৩৮

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের তীব্র সংকট। এতে ব্যাহত হচ্ছে অপারেশনসহ চিকিত্সাসেবা। অপারেশনের জন্য দেড় থেকে দুই মাস একজনকে রোগীকে বেডে থাকতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের প্রায় ৫০ ভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশনই বন্ধ রয়েছে। সংকট কাটাতে স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নিয়োগের পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও প্রশিক্ষিত সার্জন থাকা সত্ত্বেও অ্যানেসথেসিওলজিস্ট না থাকায় সার্জনরা অপারেশন করতে পারছেন না। মানুষের শরীরে যে কোনো অস্ত্রোপচার লোকাল অ্যানেসথেসিয়া, জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া কিংবা রিজোনাল অ্যানেসথেসিয়া ছাড়া সম্ভব নয়। আইসিইউ পরিচালনা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছাড়া অন্যরা করতে পারেন না। সার্জনের ভুলে রোগী মারা যায় না, অ্যানেসথেসিওলজিস্টের ভুলে মারা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনাকালে সারা দেশে জেলা সদর হাসপাতালে ভেন্টিলেটর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। যেসব জায়গায় অ্যানেসথেসিওলজিস্ট আছেন সেখানে আইসিইউ ও অপারেশন চালু আছে। তবে সব জায়গায় অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ডাক্তাররা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট হিসেবে আসতে চান না। সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে তাদের আসতে আগ্রহী করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী শিগিগরই ২ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হবে। সেখানে ৫০০ ডাক্তারকে অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করতে হবে—এই শর্তে নিয়োগ দেওয়া হবে। এটা বাস্তবায়ন হলে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট দূর হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট আছেন ১১ জন। এরমধ্যে তিন জনকে কোভিড রোগীদের সেবা দিতে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৯ জন দিয়ে চলছে। অথচ নিয়মিত অস্ত্রোপচার করতে কমপক্ষে ৫০ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট প্রয়োজন। বর্তমানে এই হাসপাতালে একটা রোগীকে দেড় থেকে দুই মাস অপারেশনের জন্য বেডে শুয়ে থাকতে হয়। আর ভর্তি হতেই অপেক্ষা করতে হয় দেড় মাস। হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে সার্জনরা বসে থাকে। এতে রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এনেসথেসিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী নূর আসপিয়া বলেন, চাহিদা অনুযায়ী অ্যানেসথেসিওলজিস্ট থাকলে একজন সার্জন মাসে শতাধিক অপারেশন করতে পারেন। কিন্তু অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে সার্জনরা সপ্তাহে এক দিন অপারেশন করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয়টি জেনারেল সার্জারি ইউনিট আছে। এছাড়া সিজারিয়ান অর্থোপেডিক, ইউরোলজিস্ট, পেডিয়াট্রিক ও ক্যাজুয়ালটি নিয়মিত অপারেশন হয়। এই হাসপাতালে অনেক রোগী দুই মাস বেডে শুয়ে আছেন। কিন্তু অপারেশনের সিরিয়াল পাচ্ছেন না। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল)’র পরিচালক অধ্যাপক ডা. গণি মোল্লা বলেন, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকটে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাঠালেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয়ে তা আটকে থাকে। অথচ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, তার হাসপাতালে ২৫ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্টের মধ্যে ১০ জনকে কোভিড রোগীদের সেবা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ১৫ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট দিয়ে অপারেশন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে ২৮টি অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে মাত্র ১২টি চালু রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, রোগীরা সময় মতো অপারেশনের সুযোগ পেলে অনেক উপকৃত হবে। তাই প্রণোদনা দিয়ে হলেও অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকটের সমাধান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, এ হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বিভাগে একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট ও পাঁচ জন মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূন্য। এছাড়া ৯ জনকে কোডিভ রোগীকে সেবা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট প্রকট আকার ধারণ করা হয়েছে। জেনারেল সার্জারি ছাড়াও সিজারিয়ান, নিউরো সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি ও পেডিয়াট্রিক সার্জারি করা হয় এই হাসপাতালে। এছাড়া রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিটিউট, বক্ষব্যাধী হাসপাতাল ও ক্যানসার ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে তীব্র অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট। যার ফলে রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ থেকে সাতটি সার্জারি ইউনিট আছে। সেই হিসেবে একদিনে ওটি হওয়ার কথা পাঁচ থেকে সাতটি। কিন্তু  অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকটে একজনের পর ঘুরে অপরজনের অপারেশন ডেট পেতে ৩৫ দিন লেগে যায়। পর্যাপ্ত অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে অপারেশনের পরও ১৫ দিন রোগীকে বেডে থাকতে হচ্ছে। প্রতিদিন অনেক জটিল অপারেশনের রোগী থাকে কিন্তু তারা আইসিইউতে সিট পায় না ঐ একটি কারণেই। চিকিত্সা বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট হলো এনেসথেসিওলজিস্ট। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টস-এর তথ্যমতে, সারাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ৫০০ এনেসথিওলজিস্ট পদ রয়েছে। কর্মরত রয়েছেন ৯০০ জন। পদ খালি আছে ৬০০। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টস-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সার্জন ও গাইনি বিশেষজ্ঞরা থাকলেও সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে। গড়ে সারা দেশে ৫০ ভাগ উপজেলায় অপারেশন সম্ভব হয় না। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট। স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, তাহলে অন্য পদে তারা যেতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে তাদের নিয়োগদানের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সাম্প্রতিককালে আইসিইউ কনফারেন্সে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংকট কাটাতে দ্রুত অ্যানেসথেসিওলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ারও নির্দেশনা দেন তিনি। কিন্তু সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এনেসথিওলজিস্টের সংকট কমাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ শেষে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ এনেসথিওলজিস্টের সহকারী হিসেবে তিনি কাজ করতে পারবেন। তবে দুই বছরের প্রশিক্ষণ ছাড়া এনেসথিওলজিস্ট হতে পারবেন না। এই সংকট কাটাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। তাতে এনেসথিওলজিস্টদের সামান্য বেতন বাড়ানোর কথা বলা হলেও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা যাবে না বলে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। কিন্তু এতে সংকট দূর হবে বলে মনে করেন না সংশ্লিষ্টরা।

দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যায় অ্যানেসথেসিওলজিস্ট তৈরি হচ্ছে না উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এই বিষয়ে পড়াশোনার জন্য অনেকেই আগ্রহী হন না। এমবিবিএস পাসের পর একজন চিকিত্সক চাকরির পাশাপাশি চেম্বার করার সুযোগও পান। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া তা পারেন না। তবে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট পেশায় আসতে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এনেসথেসিওলজির তিনটি বিষয় চালু হতে যাচ্ছে। এগুলো হলো, পেইন মেডিসিন, নিউরো অ্যানেসথেসিয়া ও কার্ডিয়াক অ্যানেসথেসিয়া।

অজ্ঞানকারী চিকিত্সার ক্ষেত্রে তিনটি কোর্স আছে। এগুলো হলো এমডি (পাঁচ বছর মেয়াদি), এফসিপিএস (পাঁচ বছর মেয়াদি) ও ডিপ্লোমা (দুই বছর মেয়াদি)। সরকারি ডাক্তাররা এসব কোর্সে কম সুযোগ পান। বেসরকারি ডাক্তাররা বেশি সুযোগ পান। সংকট কাটাতে এসব কোর্সধারীদের স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত যে কত অবহেলিত তা করোনাকালে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সরকার এ খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যেতে নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পরিদপ্তরকে অধিদপ্তর করা হয়েছে। এতে ভাগ্য খুলেছে নন-মেডিক্যাল পার্সনদের। স্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনেকে আছেন। কিন্তু তারা অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন না।