সামাজিক অবক্ষয় রোধে অন্তরালের ভাবনা

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৭

ড. মো. নাছিম আখতার

পৃথিবীর জীবন্ত সৃষ্টিগুলোর মধ্যে একমাত্র মানুষই সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তার লজ্জা নিবারণের জন্য পোশাক পরিধান করতে সক্ষম হয়েছে। ছেলেবেলায় ‘টম অ্যান্ড জেরি’ কার্টুন ছবিতে দেখতাম ইঁদুর, বেড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর গায়েও পোশাক পরানো হতো। এটিও কিন্তু মানুষের লাজুক মনের শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বর্তমানে ভোগ ও বস্তুবাদিতার কারণে প্রতিটি বিষয় বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। মানুষের নগ্ন বা অর্ধনগ্ন ছবি এখন ব্যবসার বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে। স্মার্টফোনের বদৌলতে এবং ইন্টারনেটে ডাটা পরিশুদ্ধ করার অভাবে আমাদের দেশে নগ্নতা এখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ সমাজের হাতের নাগালের মধ্যে। আজকাল ১৫ থেকে ১৭ বছরের তরুণ-তরুণীর কাছে অশ্লীল ছবি লজ্জার উদ্রেক করে না। বাবা-মা দেখে ফেললে তারা লজ্জা না পেয়ে দেখার সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। বলে, এই বয়সে এ ধরনের ছবি দেখা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারে লজ্জা এখন সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়ে জাদুঘরে অবস্থান নিয়েছে।

নেতিবাচক প্রভাবগুলো কীভাবে মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন ঘটে সুশিক্ষা, ইতিবাচক নাটক, নোভেল ও চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে। কিন্তু দিনে দিনে মানুষ এগুলো দেখা ও পড়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান সময়ে একান্নবর্তী পরিবার বিলুপ্ত হয়ে অণু পরিবারে রূপ নিচ্ছে। কর্মজীবী বাবা-মায়ের ব্যস্ততার সুযোগে সন্তানসন্ততি বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বিষয়টি বাবা-মায়ের দৃষ্টিগোচরীভূত হচ্ছে কোনো সামাজিক দুর্ঘটনা ঘটার পর। তাছাড়া তরুণ সমাজের অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক পরিবর্তন। স্মার্টফোনে অশ্লীল বিষয়বস্তু দেখার ব্যাপারে নবপ্রজন্মের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারণার জন্ম নিচ্ছে এইভাবে যে এগুলো যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব থেকে আমাদানি, সেহেতু সমাজবান্ধব ও উন্নত সংস্কৃতিরই অংশ। তারা মনে করছে, বরং আমরাই পিছিয়ে আছি। সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকের খবরে দেখলাম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তিন জন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে মিশে শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি করে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আমার মতে, আমাদের তরুণ সমাজের নৈতিকতার অবক্ষয়ের প্রথম ও প্রধান কারণ হলো স্মার্টফোনের নেতিবাচক ব্যবহার এবং ইন্টারনেট ডাটার পরিশুদ্ধতায় গাফিলতি। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে আমরা যারা সার্ভারের নিয়ন্ত্রক, তারা ব্যবহারকারীর হাতে কী ধরনের ডাটা যাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিডিরেন নেটওয়ার্কের আওতায় যে ইন্টারনেট চালু রয়েছে সেটির কথা উল্লেখ করছি। এই ইন্টারনেটে গেইম খেলা সম্ভব নয়, যা শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। তাছাড়া বিডিরেন ইন্টারনেটের আওতায় অশ্লীল ছবি বা সিনেমা দেখা বা নিষিদ্ধ কিছু ডাউনলোড করা সম্ভব নয়। এতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থেই প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার করতে পারছে। সমগ্র দেশের সামাজিক অবক্ষয় রোধে প্রতিটি সার্ভারেই এমন পরিশুদ্ধতা থাকা উচিত। সরকারকে এ বিষয়ে হতে হবে শতভাগ সজাগ ও আন্তরিক। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে সন্তানের মঙ্গল কামনায় এরূপ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবেই প্রযুক্তির ব্যবহার প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

মানুষের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মানবগ্রন্থি থেকে যে জৈব রাসায়নিক তরল নিঃসরিত হয়, তাকে হরমোন বলে। হরমোন শব্দটির অর্থ ‘জাগ্রত করা’। ডোপামিন, সেরোটনিন, অক্সিটোসিন—এই তিন হরমোনের সঠিক মাত্রা মানুষকে আনন্দ দেয়। শরীরে এর মাত্রা কম বা বেশি হলে মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিষিদ্ধ ছবি, ভিডিও ও মাদক খুব দ্রুত মানবদেহে হরমোনগুলোর মাত্রার নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। এদের দ্বারা সমাজে যে কোনো নিকৃষ্ট কাজই ঘটানো সম্ভব। তাই ইন্টারনেটে তথ্যের পরিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণের সঙ্গে সঙ্গে মাদক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মাদকাসক্ত মানুষকে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য। কারণ আইন তৈরি হয় মানুষের জন্য। কিন্তু মাদকাসক্ত মানুষ বিবেক-বিবেচনা হারিয়ে পরিণত হয় সামাজিক বোমায়। সমন্বিত চেষ্টা ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই হতে হবে আন্তরিক, সজাগ ও সচেষ্ট।

আমরা যারা শিক্ষিত ও বিবেকসম্পন্ন, তারাই সমাজের অবক্ষয়ের সূচনাকারী বলে আমি মনে করি। প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে কীভাবে? সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থ খরচের দায়িত্ব আমাদের যাদের ওপর পড়ে, তারা কেউ কেউ নানান কৌশলে সরকারি সম্পদ তছরুপ করে অঢেল সম্পদের মালিক হই। কিন্তু নিজের সন্তানদের বলি, ‘তোমরা সত্ ও সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠো।’ বিষয়টি নিজ ব্যক্তিত্ব, সত্তা ও পরিবারের জন্য কতটা উপহাসের ভাবুন তো একবার! একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমরা যদি নিজে থেকে সংশোধন না হই, তাহলে সরকার একটু আন্তরিক হলেই এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব। বর্তমানে আমাদের দেশে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে যে কোনো নিবন্ধনকৃত দলিলে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই তথ্যগুলো নিয়ে সরকারিভাবে কোনো ডাটাবেজ তৈরি হয়নি। ডাটাবেজ থাকলে বিগ ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিরূপণ হবে মুহূর্তের বিষয়, যা দুর্নীতি নিরসনে ম্যাজিকের মতো কাজ করবে।

সংস্কৃতি সমাজের দর্পণ। এই দর্পণ যখন অন্যের কাছ থেকে ধার করা হয়, তখন হারিয়ে যায় শুভচিন্তা, শুভবোধের চর্চা ও ন্যায়-অন্যায় বোধ। স্বীয় সংস্কৃতিবিবর্জিত জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করি। সেখানে জনগণ যখন সিনেমা হল পূর্ণ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখে, তখন আমাদের দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ১৩০০ থেকে ২০০তে নেমে আসে। এই অবস্থার পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়।

ওপরে বর্ণিত ভাবনাগুলো একত্র করে সমন্বিত উদ্যোগে করণীয় ঠিক করলে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করে উন্নত জাতি গড়া আমাদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।

n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর