রেজাউল ইসলাম রেজা
আগামী মাসের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। পুরো পৃথিবী এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির দেশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যার ফলে তাদের নির্বাচন নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। অন্যান্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও তাকিয়ে আছে এ নির্বাচনের দিকে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় অভিবাসীদের দেশ। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। ২০১৫ সালের শুমারি অনুযায়ী, প্রায় ১১ লাখ বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি মার্কিনি হিসেবে চিহ্নিত। যা তাদের মোট জনসংখ্যার ০.০৪৬ শতাংশ।
সাধারণত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হলে, তারা স্বভাবতই যে কোনো ব্যাপারে অভিবাসীদের দোষারোপ করতে একটু বেশিই পছন্দ করেন। বিগত সময়ে ট্রাম্পও এর বাইরে ছিলেন না। ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য পাবলিক চার্জ নীতি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ নির্দেশের ফলে আমেরিকার অভিবাসীদের মধ্যে সরকারি সাহায্য গ্রহণ করলে নাগরিকত্ব অস্বীকার করার কথা বলা আছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নেই, এমন গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের আমেরিকায় প্রবেশও অস্বীকার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যদি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা মনে করেন, আবেদনকারী আমেরিকায় প্রবেশের পর সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, এমন আবেদনকারীকে ভিসা না দেওয়ার কথা বলা আছে ঐ নির্দেশনায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নির্দেশনার পর আমেরিকা জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। যেসব অভিবাসী স্বাস্থ্য সুবিধা, আবাসন সুবিধা, ফুড স্ট্যাম্পসহ সরকারি সুবিধা গ্রহণ করছেন, তাদের মাথায় হাত পড়ে। অনেককেই আমেরিকার অভিবাসন সুবিধার জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা গ্রহণ বা ফুড স্ট্যাম্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে অভিবাসন অধিকার গ্রুপের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির পক্ষেই আদালতের রায় আসে।
বিশেষ করে, এই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা চলছে। স্বভাবতই তাদেরও দৃষ্টি থাকবে ভূ-রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের দিকে। ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলের একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে এবং সেখানে বাংলাদেশকে তারা সঙ্গে চাইছে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। গত ১২ অক্টোবর ভারতের নয়াদিল্লি সফরের মধ্যদিয়ে দক্ষিণ এশিয়া সফর শুরু করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। সফরের উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টি পর্যালোচনা ও গভীর করা। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) সম্পর্কিত পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়ে আলোচনা, করোনা মোকাবিলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় দুই দেশের অংশীদারিত্ব ও যৌথ সহযোগিতা জোরালো করা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প। প্রতিবছর বিশ্ব বাজারে পোশাক রপ্তানি করেই আয় করা হয় বিপুল অর্থ।
আর এই পোশাক রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপরও আমাদের নির্ভর করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি বাড়লেও এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে তার অনেকটাই বিপর্যয় ঘটে। এসব সমস্যা সমাধানে দেশের নীতিনির্ধারকদের চোখ অবশ্যই থাকবে আসন্ন নির্বাচনের দিকে। যদিও মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরে বলে গেছেন, উক্ত নির্বাচনে ফলাফল যাই হোক, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাঘাত ঘটবে না।
রিপাবলিকান পার্টি ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’ নামেও পরিচিত। সাম্প্রতিককালে রিপাবলিকান পার্টির নীতি ছিল করের হার কমানো, বন্দুক রাখার অধিকার এবং অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে। সাধারণভাবে দেখা যায়, আমেরিকার অপেক্ষাকৃত গ্রামীণ এলাকাগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থন বেশি জোরালো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি পরিচিত নাগরিক অধিকার, অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে তার উদারনৈতিক অবস্থানের জন্য। তারা মনে করে, স্বাস্থ্য বিমার সুযোগ দেওয়ার মতো জনগণের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের আরো বড় ভূমিকা পালন করা উচিত। আমেরিকার শহর অঞ্চলগুলোতে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থন জোরালো বলে দেখা যায়। উপরিউক্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল অবশ্যই চাইবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
