প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষায় শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। আমরা কারো সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না, আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু যদি কখনো আমরা আক্রান্ত হই, সেটা মোকাবিলা করার মতো শক্তি যেন অর্জন করতে পারি, সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে চাই।’
গতকাল বুধবার সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনটি ব্রিগেড এবং পাঁচটি ইউনিটের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশ যুদ্ধ নয় বরং শান্তি চায় এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখেই এগিয়ে যেতে চায়। তিনি সেনাসদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘পবিত্র সংবিধান এবং দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাত পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনা সেনানিবাসে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ পূর্বক সদর দপ্তর সাত স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেড, প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড, সদর দপ্তর ২৮ পদাতিক ব্রিগেড এবং ৪৯ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ১২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন, ৬৬ ইস্ট বেঙ্গল, ৪৩ বীর ও ৪০ এসটি ব্যাটালিয়নের পতাকা উত্তোলন প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৭ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর লেবুখালী, পটুয়াখালী সেনানিবাসের এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বর্ণিত ব্রিগেড ও ইউনিটসমূহের পতাকা উত্তোলন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ সেনাবাহিনীকে একটি প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক সাজসজ্জায় সজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি দেশ গঠন ও বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ ও অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেন। যুদ্ধের ভয়াবহ রূপ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরাও সেই ভুক্তভোগী। কাজেই আর সেই ধ্বংসযজ্ঞে আমরা যুক্ত হতে চাই না। শান্তির পথ বেয়ে আমরা প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জীবনমান উন্নত হোক এবং সমগ্র বাংলাদেশের মানুষেরই জীবনমান উন্নত হোক। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।’
শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি শৃঙ্খলা বজায় রেখে আপনাদের স্বীয় কর্তব্য যথাযথভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাবেন, সেটাই আমি আশা করি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসের প্রতীক। সেভাবেই মানুষের আস্থা অর্জন করেই আপনাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘পেশাদারিত্বের কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের জন্য আপনাদের সবাইকে পেশাগতভাবে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সত্ এবং মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে।’ তিনি পটুয়াখালীর লেবুখালীতে ৭ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে বলেন, পদ্মার এ পারে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো ব্রিগেড ছিল না, যে কারণে আমরা এখানে সাত পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের সরকারের সময় সেনাবাহিনীতে অনেক আধুনিক যানবাহন, হেলিকপ্টার, সমরাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি সংযোজন করা হয়েছে। এভাবেই দ্রুত ও সমন্বিত আধুনিকায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিশ্বের দরবারে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপও তার সরকার নিয়েছে এবং এতে সফলকাম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশের উন্নয়নে এবং যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল ভূমিকার জন্য সেনাবাহিনীর সব সদস্যের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নেও সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল ভূমিকার স্বীকৃতি দেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাকালীন আপনারা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে উজ্জ্বল করেছেন। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বিশাল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।’
সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের নানা পদক্ষেপের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সাঁজোয়া এবং আর্টিলারি কোরের জন্য আধুনিক গান ও মিসাইল ক্রয় করা হচ্ছে। পদাতিক বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ইনফ্যান্ট্রি গেজেট ক্রয় করা হয়েছে। আমাদের মিলিটারি একাডেমির ভিত্তিটা জাতির পিতা করে গিয়েছিলেন, আজকে তা বিশ্বে প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এর মধ্যে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও করোনা ভাইরাসের কারণে সেটা কিছুটা স্থবির হয়ে গেছে। তার পরেও আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য আমরা সর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইনশাল্লাহ আমরা সফল হব।
শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এবং দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা নিয়েই আপনারা স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করবেন, সেটাই আমরা চাই। ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।’ তিনি এ সময় করোনা ভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভ সম্পর্কেও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠান শেষে সেনাবাহিনী প্রধান শেখ হাসিনা সেনানিবাসে নবনির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাগণ, অসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ ও বিভিন্ন পদবির সেনাসদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
