বান্দরবান একটি সমৃদ্ধ পাহাড়ি এলাকা। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অন্য পাহাড়ি এলাকা থেকে অধিকতর নান্দনিক ও আকর্ষক বলে প্রতীয়মান হয় সকলের কাছে। এখানকার প্রধান জনসমাজ মারমা জাতিগোষ্ঠী। তাদের জীবনধারায় নিবিড় সাংস্কৃতিক অভিরুচির নানামাত্রিক বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। নৃত্যের লালিত্য, সংগীতের মাধুর্য এবং অতিথিপরায়ণতার সোহবতে মারমা জাতিগোষ্ঠীর অন্তরের সম্পদের গভীরতা অনুধাবনে আনন্দ পাওয়া যায়। মারমা আদিবাসী সমাজে আজও গীতিকবিতার চর্চাই প্রধান অনুরণন। ওই ধারায় গোত্রজীবনের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় কৃত্যও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দ্বিতীয় মারমা জাতিগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ। এখনো তার বেশ গভীর রেশ আছে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে। প্রধানত জুমচাষকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আদি জুমিয়া-সংস্কৃতিবলয়। সমাজের সংহতি ধরে রাখতে যৌথ প্রয়াস দরকার, এ রকম একটি সংকেত জুম চাষাবাদের মধ্যে সংগুপ্ত রয়েছে। যার অভিন্ন উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে এই অঞ্চলের অন্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোও। ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার অংশরূপে জুমভূমি চাষোপযোগী করা, সেখানে বীজবপন থেকে উদীয়মান চারার নিবিড় পরিচর্যা, পর্বে-পর্বে ফসল ওঠানোর প্রক্রিয়াটির সঙ্গে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, অর্থ ও শ্রমবিনিয়োগ, সামাজিক-পারিবারিক মায়া-মমতা, যৌথ নৈতিকতার সংলগ্নতা আর উত্সবের স্বীকৃতিও অবলীলায় যুক্ত হয়েছে এখানে। এসবের নানামাত্রিক ব্যঞ্জনা পাহাড়ের মনন থেকে ছন্দোবদ্ধ অভিব্যক্তিরূপে প্রকাশিত কবিতা, গান ও সুর জীবনের অমলিন দীপশিখা হয়ে আছে। সামগ্রিকভাবে আধুনিক মারমা জীবনও ওই অবচেতনার ছায়া থেকে বিযুক্ত নয়। সেইসঙ্গে সমকালীন সাংস্কৃতিক চিন্তা-ভাবনার বহুমুখিতা অনেক মারমা তরুণ-তরুণীকে প্রধানত মাতৃভাষায়, কখনো বা বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষায়ও কবিতা লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। বিশ্বমানবের কল্যাণ, মানুষে-মানুষে মৈত্রীভাবনার উন্নয়ন, স্বদেশের সৌন্দর্যের প্রশংসা, স্থানিক রূপময়তার কীর্তন আর সাংগ্রাইয়ের (পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক সংক্রান্তির উত্সব) শুভকামনায় ভেজা ওসব কবিতা পাহাড়ের কুহেলি আর ঝোপালু অরণ্যের সোঁদাগন্ধ এনে দেয় পাঠকের মনে।
বান্দরবান জেলার বাসিন্দা, বিশিষ্ট শিক্ষক ও সমাজব্রতী ক্য শৈ প্রু খোকা, শিক্ষা ও উন্নয়নভাবুক শৈ অং প্রু, কবি মংক্য শোয়েনু নেভী, পু চ নু মারমা, উ উইন মঙ জলি, মং সিং ঞো, চাই সুই হ্লা ও অং শৈ সিং মংরে-এর কবিতা বা গানের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরার পূর্বে পাঠ করে নেওয়া যাক ক্য শৈ প্রুর ‘মৈত্রী-মঙ্গলের গান’ গীতিকবিতাটি—
‘মৈত্রী ও মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ হোক
সুখী আর প্রাণবন্ত হোক
সকল মানুষ মাঙ্গলিকবোধে প্রস্ফুটিত হোক;
যারা বিদ্যালয়ে যায়, তারা বিকশিত হোক
কৃষক ও জুমিয়ারা ফলবন্ত হোক
শ্রমজীবী জনসাধারণ আনন্দিত হোক
আমোদিত হোক সকলেই;
অমরাবতীর মতো চিরস্থিতি হোক আমার এদেশ
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত হোক
এই সভ্যতা, সংস্কৃতি চিরজীবী হোক
গীতবাদ্য-শিল্পকলা চারুময় হোক;
জনসাধারণ, সকল শ্রমজীবী সুখী হোক
সকল হূদয় অপার আনন্দে উন্মোচিত হোক।’
ক্য শৈ প্রু, শৈ অং প্রু, মংক্য শোয়েনু নেভী, পু চ নু মারমা, উ উইন মঙ জলির কবিতায় আদি ও উজ্জ্বল অতীতের মন্ময় সংঘারামের ধ্বনিই যেন প্রতিধ্বনিত হয় চিত্তের প্রশান্তিতে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও ইতিবৃত্তের প্রতি অনুরাগ সঞ্চারিত হয় প্রাণের স্পন্দনে। এরই পাশে রয়েছে বহমানকালের তারুণ্যের ‘শতজল ঝরনার ধ্বনি’ও। তরুণদের অন্তর্লোক কখনো কখনো মানতে চায় না চিরায়তের প্রশান্ত বিধি ও বিধানাবলি। কেননা সামনে তাদের জীবনের নতুন স্পৃহার ভুবনবিদারী উদ্বেল ডাক। টানে যা দুর্বার অস্থির অনুভবের তাড়নায়। এ তার তারুণ্য ও সৌন্দর্যের অহংকারও বটে। অলংকারও। জীবন তাকে মত্ত করে জীবনেরই অতল আহ্বানে। তাই স্বর্গ বা নরকের আদিসত্যের মোহপাশ বিচলিত করে না এ সত্তাকে। অতএব, তরুণ কবি মংসিংঞো পারিপার্শ্বিকতাকে শোনাতে চান তার ইহচেতনার অনুরণন ও অভিলাষের যত কথা।
মংসিঞো’র কবিতায় কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাচার আছে। বৌদ্ধপুরাণের জাতকের গল্পমালার চরিত্র বোধিসত্ত্ব বিশ্বন্তরের ভাগ্যলিপিকে যথাযোগ্য মান্য করেও যা নিজস্ব চৈতন্যে ফিরে আসার কথা বলে। আর তা হলো :আজকের বিশ্ববাস্তবতা। নানা প্রলোভনে বাধাপড়া এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার গ্রাসে অসহায় সমর্পণে একরকম বাধ্য হওয়া দেশ ও জাতিগুলোর ব্যাপক অংশের ব্যথা-বেদনার ইতিহাস তাকে বিচলিত করে। সব জেনেশুনেও এ গ্রহবাসী তথাকথিত জ্ঞানীজন ও বুদ্ধিজীবীদের সেই কৃষ্ণবিবরে আত্মাহুতির গল্প তার অন্তরে ব্যথার অনুভূতি জাগিয়ে রাখে সর্বক্ষণ। এ নিগড়ে জড়িয়ে চলছে যেন বিশ্বজুড়ে ট্র্যাজেডির নতুন-নতুন মঞ্চায়ন। ‘সোনার শৃঙ্খল’ কবিতার স্রষ্টা মংসিংঞো যেন তা-ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন।
‘দু’টি পায়ে মাড়াবো না আমি আর তাবতিংস স্বর্গসিঁড়ি
দুঃখ ভারাক্রান্ত মৃন্ময় পৃথিবী ফেলে ব্রহ্মলোক কিংবা
পরিনির্বাণে যাবো না
অর্হত্ব মার্গ ও ফল নিয়ে সিদ্ধার্থের সাথে নির্বাণে গিয়েছ যারা, যাও
চতুরার্য সত্য বিদর্শনে এই সংসারের চক্র
ছিন্ন করবো না কোনোদিন
বোধিসত্ত্ব বিশ্বন্তরের মতন নিজ কর্মফলে
জন্ম-জন্মান্তর বিপাকে-বিপাকে
বীরভোগ্যা বসুন্ধরা
বাধা পড়ে আছে অসুরের সোনার শৃঙ্খলে।’
বৌদ্ধ মিথের পরিকাঠামোয় ধারণ করা এ অনুভূতিমালায় নতুন জীবনমন্থনের জয়াশা পাঠককে সচকিত করে ও আনন্দিত করে।
মংসিংঞো’র পরবর্তী সময়ের মারমা তরুণ অংশৈসিং মংরে। শংখ বা সাঙ্গু নদীবিধৌত শৈলশহর বান্দরবান পরিযায়ী ও স্থানিক বাণিজ্যপ্রয়াসী মানুষের গমনাগমনে মুখর এক প্রাচীন জনপদ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এ পাহাড়ি জনপদ তার আশপাশের কোথাও উঁচু, কোথাও নমিত পাহাড়, নানা গতিবেগের ঝিরি-ঝরনার কলধারায়, পাশাপাশি নানাবর্ণের মানুষের বিচিত্র পদভারে সর্বদা সপ্রাণ ও প্রীতিময়। জীবনচাহিদার বিচিত্র আশা-উচ্চাশা ও উল্লাস-বেদনাকে এ শহর বাস্তবোচিত শুশ্রূষাদান ও পরাবাস্তব প্রাণনায় প্রসারিত করে এলেও এ তরুণের পর্যবেক্ষণ ওই জীবনধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নানা কৌণিক ও জাগরচৈতন্যে। কেননা সেখানে তার চোখে অনুরাগ মানে কখনো সীমাছাড়ানো জৈবচিত্কার, সৌন্দর্যপ্রিয়তার অন্য নাম সুমিত জীবনে ছন্দহীনতার ক্রন্দন। এ তরুণের কাছে ভালোবাসার পবিত্রতা আর শিল্পের একটি গভীর-গহন ডানারূপে কাব্যচর্চা আনন্দদায়ী, পূজনীয় ও সভ্যতার সদ্ভাব। এর বাইরে আলাদা করে রূপের আরাধনা তার কাছে অর্থহীনতার গোলকধাঁধামাত্র। কাজেই দেহজরূপের অধিকারী এবং ওই রূপের জন্যে উন্মাদেরা যখন তথাকথিত সৌন্দর্য আর ভালোবাসার বড়াই করে, তাদের বোধের সীমাবদ্ধতাকে অপাঙেক্তয় মনে হয় এ তরুণের কাছে। তার সূক্ষ্ম অনুভূতি এই যে, প্রকৃত ভালোবাসার শ্রদ্ধা নিয়ে সৌন্দর্য ও কাব্যকে হূদয় ও চেতনার অতলে অধিষ্ঠিত করতে হবে সর্বাগ্রে। তারপরই হতে পারে জীবনের প্রকৃত আরাধনার শুরু।
তার ‘ভালোবাসায় কী স্বাদ পাও’ কবিতাটি পাঠ করা যাক :
‘বলো, ভালোবাসায় কী স্বাাদ তুমি পাও?
জানি, মাংসের পচনধরা ফসিল তোমার কাছে আরাধ্য
কবির যক্ষের ধন কবিতার ছন্দ
তোমার কাছে মূল্যহীন
তীক্ষ অনুভূতিতে তুলে ধরা শৈল্পিক রূপের চেয়ে
দেহজ রূপ নিয়ে তুমি আত্মমগ্ন
তুমি রূপ বোঝ, শিল্প বোঝ না
শিল্পের মর্ম তোমার কাছে অর্থহীন, অপাঙেক্তয়
মিনতি করি, ভালোবাসা আর শিল্পকে এক করে দেখ না
ভালোবাসতে শেখো, শিল্পকে শ্রদ্ধা করো
ভালোবাসার প্রকৃত মমতায়
শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখো অনন্তকাল।’
পার্বত্য অঞ্চলের মারমা জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে সারবান সাংস্কৃতিক সম্ভার। পাহাড় ও অরণ্যের দৃশ্যকল্পের ভাঁজে, ঝিরি ও ঝরনার নম্র কলতানের পাঁজরে-পাঁজরে ওরা চিরকাল জীবনকে সাজিয়েছে মননের নিভৃত দেউটি জ্বালিয়ে। অস্তিত্বের শাশ্বত ব্যাকরণে মারমাসমাজ যোগ করেছে নতুন-নতুন উদ্দীপনা, বেদনা ও উদ্ভাসনের ধারা। উদার আর সহজতার নানা সৌরভ। জীবন নামক বহুমাত্রিক আনন্দ বেদনা হতাশা ও বিলয়ের সম্মিলিত বোধ-অনুভূতিগুলোর পরিবর্তনশীল আচরণে ওরা বিশ্বাস করে অমিতাভ গৌতমের নির্দেশিত নির্বাণেই প্রকৃত পরিত্রাণ।
ওই পবিত্র, বিস্তারিত অনুধ্যানে আছে সংহত জীবন-অভিজ্ঞতার প্রীতি ও ধৃতির কৌলিন্য।
