ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ নোমান। এবারের করোনাকালে তিনি একটি বিষয়ে 'বড় বিস্ময়' বনে যান, কেননা এবারের করোনাকালে তিনি তেমন একটা মশার উপদ্রব দেখতে পাননি।
তিনি বলেন, ঢাকায় আমার তিন বছরের মধ্যে এই প্রথম 'মশা-মুক্ত অভিজ্ঞতা' পেলাম।
মোহাম্মদ নোমান জানান, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যকলাপ হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পৌর কর্মীরা নিয়মিত তার এলাকায় মশক নিধনের স্প্রে করতো।
নোমান বলেন, তারা (কর্মীরা) এমনকি আমার বাসায়ও আসতো।
একইভাবে রামপুরার বাসিন্দা নয়ন মিয়া বলেন, মাঝেমধ্যে বিকেলে ঘুম থেকে উঠে স্পে মেশিনের শব্দ শুনতাম।
মশার প্রজননের '৬২৯ টি হটস্পট' থাকা সত্ত্বেও অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকার এই অংশে ডেঙ্গু রোগী নেই বললেই চলে।
অক্টোবরে পুরো ঢাকায় মোট ১১৬ টি কেস শনাক্ত হয়েছে এর মধ্যে উত্তর ঢাকায় মাত্র ১১ জন ডেঙ্গু রোগী। উত্তরের মেয়র ইতোমধ্যে আতিকুল ইসলাম ১০ নভেম্বর থেকে প্রতি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ দিনের 'চিরুনি অভিযানের' ঘোষণা দিয়েছেন।
গত ১৭ -৩১ অক্টোবর পর্যন্ত লার্ভা নিধনের জন্য পৌর কর্মীরা সমস্ত প্রজনন স্থানে 'নোভালুরন' নামে চতুর্থ প্রজন্মের লার্ভিসাইড কীটনাশক প্রয়োগ করে।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মমিনুর রহমান মামুন এক গণমাধ্যমকে বলেন, মেয়রের নেতৃত্বে আমাদের বিশধ পরিকল্পনা ছিল - বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রজনন স্থল ধ্বংস করা।
মমিনুর রহমান মামুন আরও বলেন, তিনি (মেয়র) মহামারীর সময়ে আমাদের কর্মীদের কী করতে হবে তা নির্দেশ দিতে মাঠে ছিলেন।
ফরিদুল নামে ১৯ নং ওয়ার্ডের মশক নিধন কর্মী বলেন, তিনি আমাদের কাছে এসেছেন, পাশে বসেছেন, আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে খেয়েছেন, এবং আমরা কী করছি এবং আমাদের কী দরকার তা শুনেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের জন্য এটি অনেক উৎসাহজনক ছিল। সেটি অনেক খারাপ সময় ছিল কিন্তু আমরা ভীত হই নি কেননা আমরা জানতাম আমাদের মেয়র আমাদের সঙ্গে আছে।
করোনার সঙ্গে বিগত বছরগুলোর মত ডেঙ্গুতেও ভুগছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ড। ২০১৯ সালে বাংলাদেশও ডেঙ্গুতে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তবে এই বছরের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
মেয়র আতিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, গত বছর আমরা অনেক কিছু শিখেছি। গত বছরে আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন আমাদের কার্যত তেমন কোন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, সঠিক ওষুধ এবং প্রযুক্তিও ছিল না।
তিনি বলেন, এখন আমাদের প্রায় সবকিছুই আছে।
আনিসুল হকের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৯ সালের মার্চে প্রথমবারের মত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন আতিকুল ইসলাম। আর সে মাসেই ছিল বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুম।
এরপর চলতি বছরের মে মাসে পূনরায় পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন আতিকুল ইসলাম।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসাধারণের ধারণা হচ্ছে, বাড়ির বাইরে পৌরকর্মীরা মশক নিধন স্পে করলে এডিস মশা মারা যাবে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মোতাবেক এই জাতীয় মশা বাড়ি ভিতরে অন্ধকারে বিশেষ করে খাট, কাপড় অথবা পর্দার নিচে থাকে। এসব মশা বাড়ির ভিতরের দেয়ালে বসে না। কিন্ত পরিষ্কার পানিতে প্রজনন ঘটায়। তাই বাড়ির বাইরে স্প্রে করলে এইসব মশা মরে না।
গত বছরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এই বিষয়ে জানতে পারে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। এবিষয়ে মেয়র আতিকুল বলেন, এবার ওই অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগিয়েছে।
মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশনে এমন কোন পতঙ্গবিজ্ঞানী ছিল না যাদের এই মশা সম্পর্কে জ্ঞান ছিল। তাই আমরা দক্ষ পতঙ্গবিজ্ঞানীসহ ১১ জনের দল গঠন করি যারা এই বছর আমাদের সাহায্য করেছে। আমরা আমাদের এসব জ্ঞান শহরবাসীদের সঙ্গে শেয়ার করেছি। আমরা এমনি আমাদের টিমকে বাড়ির ভিতরে পাঠিয়েছি। জনগণ আমাদের মহামারীর সময় সাহায্য করেছে।
উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লেপ্টেন্যান্ট কর্নেল মোঃ গোলাম মোস্তফা সরওয়ার বলেন, বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে এবার আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নতুন ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নোভালুরন একটি চমৎকার ওষুধ যেটি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে। আমরা এটি পানিতে প্রয়োগ করেছি এবং এটি ৯০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
তিনি আরও বলেন, এটি মশার লার্ভার ওপর কাজ করে তাই এটি পানির নিচে মাছ বা অন্য প্রাণীর ওপর কোন প্রভাব পরে না।
শেষমেশ মশা নিধনে 'সফল' মেয়র আতিকুল বলেন, আমরা এই বছরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যদি আমরা কিউলেক্স মশা মোকাবিলা করতে পারলে সহজেই আমরা 'ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম' গ্রহণ করতে পারি।
ইত্তেফাক/এসআর
