কোনো দেশই পরিপূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না, অর্থাত্ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও চাহিদা মাথায় রেখে প্রত্যেকটি দেশই অন্য দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। আবার একই সঙ্গে নিজ দেশে উত্পাদিত পণ্য বা কাঁচামাল অন্য দেশে রপ্তানির মাধ্যমেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাটিও কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় আয়ে অনেক বড় একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বলা যায় উন্নত অনেক দেশের প্রধান আয়ের উত্সও এটি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই সমুদয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রত্যেকটি দেশেরই আমদানি এবং রপ্তানির জন্য বিশেষ কিছু নীতিমালা থাকে। আবার একটি দেশ অন্য কোনো দেশে তাদের কী কী পণ্য রপ্তানি করবে বা করবে না সেটিও নির্ভর করে থাকে আন্তর্জাতিকভাবে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আমদানিকারক দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান আর অর্থনীতির ওপর।
যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর অনেক বড় একটা রপ্তানি সম্পর্ক। কেননা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। তন্মধ্যে ৬২ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় এবং প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়। উল্লেখ্য, রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই থাকে তৈরি পোশাক। এছাড়াও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাতীয় পণ্য এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ আমদানি করে থাকে মূলত এশিয়া মহাদেশ থেকে, যার মধ্যে সমগ্র আমদানি ব্যয়ের ৪১ শতাংশ বা তারও বেশি যায় চীন ও ভারতে। আর রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এবং উত্তর আমেরিকা। আরো চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে আমাদের সর্বমোট রপ্তানি আয়ের ৭৪ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
ওপরে বর্ণিত এই সমুদয় তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই যে আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় আয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যেমন : জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস, হাঙ্গেরি ইত্যাদি দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা আরো নির্ভরশীল আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর। অর্থাত্ খুবই স্বাভাবিকভাবে যদি আমাদেরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে হয়, তবে দুটি দিক লক্ষ রাখতেই হবে। এক, আমাদের রপ্তানি পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাজার বিস্তীর্ণকরণ আর দুই, আমাদের দেশের বিদ্যমান রপ্তানি বাজার দেশসমূহের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন ও দৃঢ়করণ।
ঠিক এই ব্যাপারটির জন্যই অনেক উন্নয়নশীল দেশই চাইলেও অন্য অনেক দেশের সঙ্গে যে কোনো কারণেই হোক বা জনস্রোতের দাবির মুখেই হোক, সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। কারণ বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মানে হচ্ছে ঐ দেশের বাজারে আজীবনের জন্য প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বিরাট বড় একটা হুমকি বয়ে আনতে সক্ষম।
তবে এই পরনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাজার বিকেন্দ্রীকরণ। শুধু একটি বা দুটি রপ্তানিবাজারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের পণ্যের মানকে এমন উচ্চতায় নেওয়া, যাতে শুধু পশ্চিমা দুনিয়ায় রপ্তানিতে নির্ভরশীল না হতে হয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
