কৃষিতে চাই নতুন বিপ্লব

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫০

কৃষিতে জৈব কৃষির ধারণাটি নতুন নয়। কিন্তু এটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। কারণ ষাটের দশকের দিকে “সবুজ বিপ্লব”-এর নামে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমরা যেমন আমাদের চারপাশের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছি তেমনি আমাদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছি। ক্রমাগত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমি হারিয়েছে তার ঊর্বরতা শক্তি। নষ্ট হয়েছে বাস্তুসংস্থান। হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। তাই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতে আমাদের ফিরে তাকাতে হচ্ছে পিছনের দিকে। নতুন করে ভাবতে হচ্ছে জৈব কৃষি নিয়ে।

রাসায়নিক সার ক্রমাগত ব্যবহূত হলে মাটিতে বসবাসকারী অণুজীবরা তাদের বাসস্থান হারায়। অথচ এই অণুজীবরাই মাটিতে জৈবসার হিসেবে কাজ করে, মাটির ঊর্বরতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে এরা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। জমিতে নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলে প্রতি ১০০ কেজির মধ্যে গাছ শুধু ২৮-৩০ কেজি ব্যবহার করতে পারে। বাকি রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে ধুয়ে বা গ্যাস আকারে নষ্ট হয়ে পরিবেশকে দূষিত করে তোলে। মূলত জৈব কৃষি ( organic agriculture) একটি  বাস্তবসম্মত পদ্ধতি যা ফসল উত্পাদনের পাশাপাশি টেকসই পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয়। এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। এই উপায়ে উত্পাদিত ফসল বা পণ্যকে organic food বা organic product  বলে। এই পদ্ধতিতে জমি চাষ করলে মাটি সবসময় ঊর্বর থাকে এবং এই ঊর্বরতা ক্রমাগত  বাড়তে থাকে। তাছাড়া এটি জমির জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বাড়ায়। জৈব কৃষিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে খামারজাত সার, কম্পোস্ট সার, আবর্জনা সার, হাঁস মুরগির বিষ্ঠা, হাড়ের গুঁড়া, ছাই, কেঁচো ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। আর কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয় পাতা, কাণ্ড, মূল বা বাকলের রস। নিম বা মেহগনি ইত্যাদির তৈরি নির্যাস প্রয়োগ করেও গাছের রোগবালাই এবং পোকামাকড় দমন কর যায়। তাছাড়া “আইপিএম” বা “সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার” মাধ্যমেও ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করা যায়।

উন্নত দেশগুলোতে এই ব্যতিক্রমী চাষাবাদ পদ্ধতি এবং organic food ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সরকারও জৈব কৃষির প্রতি জোর দিচ্ছে। সে লক্ষ্যে সরকার ২০১৬ সালে “জৈব কৃষিনীতি” অনুমোদন করেছে। ২০১৩ সালে সরকার প্রণয়ন করেছে নিরাপদ খাদ্য আইন, যার ৫৮ ধারায় বলা হয়েছে  মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য, কীটনাশক বা বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের জন্য ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমান দিতে হবে”। কিন্তু জৈব কৃষির মাধ্যমে এত লোকের খাদ্যের যোগান দেয়া সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে একটি বিতর্ক থেকেই যায়। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত বিশেষজ্ঞদের মতামত উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের মতে, জৈব কৃষি সারাবিশ্বের প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। Bangladesh Organic Product Manufacturing Association (BOPMA) এরই মধ্যে দেশের এক লাখ একর জমিকে অর্গানিক কৃষির আওতায় নিয়ে এসেছে। ২০২০ সালের মধ্যে পুরো দেশকে অর্গানিক কৃষির আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।

খাদ্য গ্রহণ আমাদের বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাদ্যের। আর একমাত্র জৈব কৃষিই আমাদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা দেয়। তাই আশা করা যায় জৈব কৃষির হাত ধরে কৃষিতে ঘটবে এক নতুন বিপ্লব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়